দু’কূল ভাঙা নদী
মিলন আত্রাই নদীর তীরে বসে আছে তখন বর্ষার মাঝামাঝি সময়। বর্ষার নদী জোয়ারে দু’কূল ভাঙছে। নদীর বুকে স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে সব কিছু। মিলন নদীকে একদম পছন্দ করত না, নদীতে ভাঙা গড়ার খেলা তার একদম ভাল লাগত না, নদীকে সে ভাবত সর্বনাশা, কুলনাশিনী। আজ তার ভাবনা কোথায় যে, চলে গেছে সে নিজেও অনুমান করতে পারছে না, নদীকেই তখন যেন তার অনেক আপন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে এই সংসারে নদীই বাস্তবতার মাপকাঠি।
ক’দিন থেকেই মিলন এই নদীর তীরে এসে বসে থাকছে। স্রোতের সাথে সে কি মিল খুঁজছে সে কথা কেবল মিলনই জানে আর কেউ জানে না, মিলন বাড়ি থেকে এসেছে তাও প্রায় সপ্তাহ খানেক হবে, মোবাইল ফোনটা বেশির ভাগ সময় বন্ধ করে রাখে। বাড়ির সাথে তার একদম যোগাযোগ নেই। কোথায় আছে সে কথাও মিজানকে বলতে বারণ করে দিয়েছে। মিজান মিলনের কলেজ জীবনের বন্ধু, মিজানের বাসা মান্দা উপজেলার বুড়িদহ গ্রামে, মিলনের বাড়ি নাটোরে, মিলন অনেক দিন পরে মিজানের এখানে বেড়াতে এসেছে। এসেই বলল, মিজান এবার অনেক দিন আমি তোদের বাড়িতে থাকব। মিজান বলল, মিলন তুই নিজের ইচ্ছে মত না গেলে আমি তোকে যেতে বলব না, আর হ্যাঁ তুই তোর ইচ্ছে মত ঘুরে বেড়াতে পারিস। তাছাড়া রথের মেলাতেই তুই যেতে পারিস। আত্রাই নদীর কূলের সেও সময় কাটাতে পারিস আবার প্রসাদপুর বাজারেও যেতে পারিস। ক’দিন রথের মেলায় ঘুরে ফিরে মিলনের সময় খুব ভাল ভাবেই কাটাছিল। এখন মেলা শেষ তাইতো সে নদীর তীরে বসে থাকে। মিলনের ঘর সংসার সবি আছে কিন্তু তবুও মনটা তার বিবাগী এমন কেন সে কথাটা ভাবতে গিয়ে মিলনের বুকটা ব্যথায় ভরে উঠে। মনে হয় কে যেন একরাশ কঠিন পাথর বুকের ভেতর চাপা দিয়ে রেখেছে, নিঃশ্বাস নিতে মিলনের কষ্ট হচ্ছে সে যেন মরণ যন্ত্রণায় কাতর এক মুমূর্ষু রোগী। মিজান অনেক প্রশ্নের পরে যে কথাটা জানতে পেরেছে তাতে সেও কম হতবাক নয়, মিলনের ভাঙা মন আবার ভেঙে দিয়েছে তার স্ত্রী মিনা, মিলন আর মিনার সংসার জীবন পাঁচ বছরের। বিয়ের বছর খানেক সময় মিলনের জন্য সুখের ছিল, তার পরে তার জীবনে এমন যন্ত্রণার আগ্নেয়গিরি থেকে লাভ ছড়িয়ে পড়ল যা, মিলনের সুখের সম্মতিতে জমে লাভা ভূমিতে পরিণত হলো।
মিলনের সাথে সম্পর্ক ছিলো তার পাশের গ্রামের মালা নামের এক মেয়ের। মালা এবং মিলন এক সাথে পড়াশুনা করেছে একই স্কুল ও কলেজে। একসাথে চলতে চলতে অনেকেরই প্রেমের গাছে কলি আসে ফল হয়ত হয় না তবে ফুল ফোটে। তেমনি মিলন মালার মনেও ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল। বিধিবাম বৈষয়িক পার্থক্যের কারণে মালার সাথে ঘর সংসার হয়নি মিলনের জীবনের পোড় খাওয়া অধ্যায়গুলো ব্যর্থ প্রেমিক প্রেমিকাদের জীবন থেকে মুছে ফেলতে কষ্ট হয় তার উপর যদি ভালোবাসা মায়া মমতা আদর সোহাগের অভাব হয় তাহলে কোন জন্মেও মুছে যায় না ব্যর্থতার দাগ। একদিন মালা বাবার বাড়ি বেড়াতে এসে ঘুরতে ঘুরতে চলে এলো মিলনের বাড়িতে। মিলনের বাড়ির লোকজন এবং প্রতিবেশিরা মালাকে দেখে বলল তুমি কার বউ হবে আর কার বউ হলে। এমনি ভাবে অনেক কথা হলো। কয়েক জন মেয়ে মানুষ একত্রে হলে যা হয় আর কি তাই হয়েছে? মিলন অবশ্যই এসবের কোন কিছুই জানে না। মিনার মনে সন্দেহ হয়েছে যে, এখনও মিলনের সাথে মালার সম্পর্ক আছে নইলে কেন সে মিলনের বাড়িতে বেড়াতে আসবে। সাবেক প্রেমিকের বাড়িতে বেড়াতে যেতে মেয়েদের লজ্জা হওয়া উচিত। মিলনের সম্পর্ক আছে বলেই মালা এবাড়িতে বেড়াতে আসতে সাহস পেয়েছে। মিলন নাটোর গেছে কি এক কাজে বাড়ি ফিরতে তার অনেকটা রাত হয়ে গেছে। রাতে ফিরে দেখছে যে মিনা মরার মত বিছানায় পড়ে আছে। মিলন খাবার খেতে বার কয়েক ডাকলো। মিনার কোন সাড়া শব্দ নেই। শেষে বিছানার কাছে গিয়ে যখন গায়ে হাত দিয়ে একটা ঝাঁকুনি দিল তখন বলল, ভাত টেবিলে দেওয়া আছে। আমি উঠতে পারবনা আমার মাথা ব্যথা করছে। মিলন জানে মিনার মাথা
ব্যথার অসুখ নেই। আজ হঠাৎ মাথা ব্যথার কারণটা কী? সারারাত মিনা মিলনের সাথে কোন কথা বলল না। মিলন অনেক বার তাকে কথা বলাতে চেষ্টা করেছে। না কিছুতেই মিনা মিলনের সাথে কথা বলেনি। মাথা ব্যথা ভাল করতে মিলন মিনার মাথায় মলমও লাগিয়ে দিয়েছে, কিন্তু না কোন কাজ হয়নি। আসলে ব্যথাটা তো মিনার মনে বাইরে মলম লাগালে তা কি সারে। পরে মিলন সব কিছু জেনেছে এবং প্রতিনিয়ত মালাকে কেন্দ্র করে কথা শুনতে হচ্ছে। মিলন বলেছে মিনা ছেলেদের ভালোবাসার মানুষ যদি অন্যের হয়ে যায় তাহলে ঐ প্রেমিক ছেলেটা ঐ মেয়েটাকে ঘৃণা করতে শুরু করে কেবল ভুলে যাবার জন্য। আমি মালাকে ভালোবেসেছিলাম সত্যি কিন্তু এখন আমি
ভালোবাসি না। এখন ভালোবাসি আমি তোমাকে। আমার সব ভালোবাসা তামাকে দিয়েছি তুমিই এখন আমার সবকিছু। মিনার সন্দেহ আর মানষিক অত্যাচার সইতে না পেরে মিলন মিজানের এখানে এসেছে। সে আর বাড়িতে ফিরে যেতে চায় না, মিলনের বাড়ি ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে মিজান নদীর তীরে গেল, দেখল মিলন বসে আছে। মিজান বলল, নদীর আর কি দেখবি মিলন নদী তো একূল ভাঙে ও কূল গড়ে। কিন্তু মিজান আমি যে দু’কূল ভাঙা নদী আমি কি করব? আমি কোথাই যাব, নদীর যেমন চলার শেষ আছে তেমনি তোরও একটা ঠিকানা মিলবে চল অনেক রাত হয়েছে বাড়ি চল। মা খাবার নিয়ে বসে আছে। মিলন বলল, চল মিজান বাড়ি যাই দু’জনে যন্ত্রের গতিতে বাড়ির পথে চলতে লাগল।