শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬

বৃষ্টিভেজা বিকেলের ভালোবাসা

তন্ময় নিসার ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:৪৯ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
তন্ময় নিসার ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:৪৯ অপরাহ্ন
বৃষ্টিভেজা বিকেলের ভালোবাসা

বিকেলের আকাশটা সেদিন হঠাৎ করেই কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় মানুষজন ছুটছিল যার যার গন্তব্যে। ঠিক তখনই বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল নীল। হাতে একটা পুরোনো বই, কাঁধে ব্যাগ, আর চোখে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা। চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে ফিরছিল সে। ফল কী হবে, তা জানত না। কিন্তু মনের ভেতর একটা অজানা শূন্যতা কাজ করছিল। যার কোনো কূলকিনারা ছিলো না। অসীম শূন্যে সে ওজনহীন ক্ষুদ্রকণার মত। মনকে কোনেভাবেই স্থির করতে পারছিলো না। প্রকৃতিতে একটা গুমোট ভাব। গাছপালা কেমন যেন স্থির, একটাও নড়ছে না। পথের মানুষগুলো যেন মানুষ না কোনো যন্ত্র। কোনো অনুভূতি নেই। ছুটছে তো ছুটছেই। পলক ফেলার সময়টুকু নেই। সারাক্ষণ শুধু কাজ আর কাজ। আত্মোন্নয়ন ছাড়া মানবিক কোনো চিন্তার স্থান যেন তাদের মাথাতে নেই। 

হঠাৎ করেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। সবাই ছুটে আশ্রয় নিতে লাগল। নীলও পাশের একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক তখনই একটি মেয়ে দৌড়ে এসে একই দোকানের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিল। ভিজে যাওয়া চুলগুলো মুখে লেগে ছিল। মেয়েটি একটু হেসে বলল, আজকের বৃষ্টি যেন কাউকে ছাড়বে না।

নীলও হেসে উত্তর দিল, মনে হচ্ছে তাই।

এই ছিল তাদের প্রথম কথা। মেয়েটির নাম ছিল মেঘলা। নামের মতোই শান্ত, কোমল আর মিষ্টি স্বভাবের। বৃষ্টি থামা পর্যন্ত তারা গল্প করল। জানতে পারল, দুজনেরই বই পড়ার খুব শখ। বিদায়ের আগে মেঘলা বলল,

হয়তো আবার দেখা হবে।

নীল শুধু হেসেছিল। কিন্তু মনে মনে সে চাইছিল, কথাটা যেন সত্যি হয়।

কয়েকদিন পর সত্যিই আবার দেখা হয়ে গেল। শহরের একটি লাইব্রেরিতে। নীল বই খুঁজছিল, আর মেঘলা ঠিক পাশের তাক থেকে একই বইটি নিতে গিয়ে তার সঙ্গে ধাক্কা খেল। ‘আবার আপনি?’-হেসে বলল মেঘলা।

মনে হচ্ছে ভাগ্য আমাদের বারবার দেখা করাচ্ছে, নীল উত্তর দিল।

সেদিন তারা অনেকক্ষণ গল্প করল। বই, গান, সিনেমা, স্বপ্ন -সবকিছু নিয়েই। ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব গভীর হতে লাগল। প্রতিদিন সকালে শুভেচ্ছা বার্তা, দুপুরে খোঁজ নেওয়া, আর রাতে দীর্ঘ ফোনালাপ -সবকিছুই যেন জীবনের অংশ হয়ে গেল।

মেঘলা ছিল খুব সাধারণ পরিবারের মেয়ে। তার বাবা একজন স্কুলশিক্ষক। ছোটবেলা থেকেই সে শিখেছিল মানুষের পাশে দাঁড়াতে। অসহায়কে সাহায্য করতে। অন্যদিকে নীলের পরিবার আর্থিকভাবে খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। তাই নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে তাকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। অস্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা জীবন সংগ্রামে ও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতেই ব্যস্ত ছিলো। তার অন্য কোনো দিকে তাকানোর সময় ছিলো না। সে কেবল লক্ষ্যের দিকে ছুটে গেছে।  কোনোদিকে তাকানোর সময় ছিল না। মা-বাবার সাথে নিজে ক্যারিয়ার এসবই ছিল তার নিত্য সময়ের কথা। 

একদিন নীল জানাল, সে একটা চাকরি পেয়েছে। আনন্দে মেঘলা তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, আমি জানতাম তুমি পারবে। নীল মুচকি হেসে বলল, তোমার বিশ্বাসটাই আমাকে সাহস দিয়েছে। আর তোমার এ সাহসই আমার নিষ্কন্টক বল। যে বলে আমি বলীয়ান।

স্বপ্নে মোড়া দিনগুলো দারুণভাবেই অতিবাহিত হচ্ছিল। চারদিক শুধুই স্বপ্নে মোড়া। কিন্তু জীবনে সুখের পাশাপাশি পরীক্ষা আসে। হঠাৎ একদিন মেঘলার বাবার অসুস্থতার খবর এল। সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই তার কাঁধে এসে পড়ল। সে আগের মতো সময় দিতে পারছিল না। বাড়ির দেখাশোনা বাজার সদায় আর অর্থে জোগান সবই তার কাঁধে। তবু সে নিরাশ না হয়ে শান্ত হয়ে সব হ্যান্ডেল করে।

নীল বুঝতে পারছিল, কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে তার মন খারাপ হয়ে যেত। একদিন অভিমানে সে ফোন ধরল না। মেঘলা বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করতে পারল না। পরদিন তারা দেখা করল সেই পুরোনো চায়ের দোকানে।

মেঘলা শান্ত গলায় বলল, ‘তুমি কি সত্যিই ভাবো আমি ইচ্ছে করে দূরে সরে গেছি?’

নীল মাথা নিচু করে বলল, ‘না... শুধু তোমাকে খুব মিস করছিলাম।’

মেঘলা হাসল। তারপর বলল, ‘ভালোবাসা মানে শুধু পাশে থাকা না। কখনও কখনও দূরে থেকেও একজন আরেকজনকে বুঝতে পারা। একজন আরেকজনকে মন দিয়ে অনুধাবন করা।’

এই কথাগুলো নীলের হৃদয় ছুঁয়ে গেল। সে বুঝল, সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাসে, অভিমানে নয়। সময় গড়িয়ে চলল। মেঘলার বাবা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। নীলও চাকরিতে ভালো অবস্থানে পৌঁছাল। একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল, আর দেরি নয়।

সেই প্রথম দেখা হওয়া চায়ের দোকানেই সে মেঘলাকে ডাকল। আকাশে আবারও মেঘ জমেছে। হালকা বাতাস বইছে। নীল পকেট থেকে একটি ছোট্ট আংটি বের করে বলল, ‘যেদিন প্রথম তোমার সঙ্গে এই বৃষ্টির দিনে দেখা হয়েছিল, সেদিন বুঝিনি তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হয়ে উঠবে। আজ আমি তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। তুমি কি সারাজীবন আমার সঙ্গে পথ চলবে?’

মেঘলার চোখে জল চলে এল। তার অন্তর দুমড়ে-মচড়ে উদগত কান্নার কম্পন কণ্ঠনালী বেয়ে উপরে উঠে এলো, যেখানে আছে দৃষ্টির ঠিকানা আছে ডাগর দুটো চোখ। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ। আমি তোমার সঙ্গেই জীবন কাটাতে চাই।’

ঠিক তখনই আবার বৃষ্টি নামল। আর এ যেন অঝর ধারা। বৃষ্টির ঝাপটা আর দমকা হাওয়ার ঝটকা ভিজিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। চারপাশের মানুষ ছুটতে লাগল, কিন্তু তারা দুজন দাঁড়িয়ে থাকলো। যেন সেই প্রথম দিনের স্মৃতিটা আবার ফিরে এসেছে।

কয়েক মাস পর দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হলো। খুব জাঁকজমক না, কিন্তু ভালোবাসায় ভরা একটি অনুষ্ঠান। বন্ধু আর আত্মীয়স্বজনের হাসি-আনন্দে দিনটি হয়ে উঠল স্মরণীয়। বিয়ের পরও তারা আগের মতোই একে অপরের বন্ধু হয়ে রইল। ছুটির দিনে তারা লাইব্রেরিতে যেত, নতুন বই কিনত, বিকেলে চায়ের দোকানে বসে গল্প করত। জীবনের ব্যস্ততা বাড়লেও তারা কখনো একে অপরকে সময় দিতে ভুলত না।

একদিন মেঘলা বলল, ‘জানো, আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যদি সেদিন বৃষ্টি না হতো?’

নীল হেসে উত্তর দিল, ‘তাহলে হয়তো অন্য কোনো অজুহাতে আমাদের দেখা হতো। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা তার পথ নিজেই খুঁজে নেয়।’

মেঘলা নীলের হাত শক্ত করে ধরল। দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছিল। ঠিক যেমন তাদের জীবনের কঠিন সময়ের পর সুখের আলো এসেছিল। সেদিন তারা বুঝেছিল, ভালোবাসা শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতির নাম নয়। ভালোবাসা মানে প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, একে অপরকে বোঝার চেষ্টা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া, আর সুখ-দুঃখে পাশে থাকা।

বছর কয়েক পর তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হলো। তার নাম রাখা হলো ‘বৃষ্টি’। কারণ সেই এক বৃষ্টিভেজা বিকেলই তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পের শুরু লিখেছিল।

যখনই বৃষ্টি নামত, তারা তিনজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভেজা মাটির গন্ধ উপভোগ করত। ছোট্ট বৃষ্টি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত, ‘মা, বাবা, তোমরা বৃষ্টি এত ভালোবাসো কেন?’

নীল আর মেঘলা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসত। তারপর একসঙ্গে বলত, ‘কারণ বৃষ্টি আমাদের শুধু ভিজিয়ে দেয়নি, আমাদের এক করে দিয়েছে।’

আর সেই হাসির মধ্যেই লুকিয়ে থাকত তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। সময়, দূরত্ব কিংবা হাজারো বাধা তাকে থামাতে পারে না। সে কেবলই সামনের দিকে ছুটে যায়। আপন করে পাওয়ার আকাক্সক্ষা অদম্য। যে ভালোবাসার ভিত গড়ে ওঠে বিশ্বাস, সম্মান আর আন্তরিকতার ওপর, সে ভালোবাসা জীবনের প্রতিটি ঋতুতেই নতুন করে ফুটে ওঠে।