বেকারত্ব
তমালের এখন প্রতিদিনের কাজ বলতে, খাওয়া, ঘুমানো আর তাস খেলা। আর এই কাজগুলো সে রুটিন মাফিকই করে। শুধু রাতে ঘুমুতে যাওয়া অনেক দিন রুটিন মোতাবেক হয় না। এছাড়া ছাত্রজীবনের রুটিনটাকে সে বেকার জীবনেও ধরে রেখেছে। তফাৎ শুধু বিষয়ের। ছাত্রজীবনে পড়ালেখা করত, এখন ঘুমায় আর তাস খেলে। রুটিন ঠিকই আছে। সকাল দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে ঘুম থেকে ওঠে। বিছানা ছাড়ার আগে এপাশ ওপাশ হয়ে একটু আলসেমি ভেঙে নেয়। তারপর আধাঘণ্টা ধরে বাথরুম সারে। মা বা বড় ভাবিকে ডেকে দুমুঠো খেয়ে নেয়। তারপর লুঙ্গির গাঁটে এক সেট তাস নিয়ে বের হয়। গ্রামের পূর্ব ধারে নদীর পাড়ে মেহগনি গাছের বাগানে প্রতিদিনই এই সময়ে বসে তাসের আড্ডা। তমালের মতো আরও কয়েকজন বেকার বসে তাসের জলসায়। তাদের সাথে গ্রামের কিছু অশিক্ষিত অকর্মা লোকজনও বসে। এই খেলাকে ঠিক জুয়া বলা যাবে না, সামান্য টাকা দিয়ে খেলা। সময় কাটানো বলা যেতে পারে। লাভ বা লোকসান হলে, তা পঞ্চাশ একশ টাকার মধ্যে। ছাত্রজীবনে তমাল সিগারেট টানলেও, এখন পয়সা কড়ির অভাবে বিড়ি টানে। এই যা, তমালকে নিয়ে এত কথা হচ্ছে, এখনও তমালের পরিচয় বলা হয়নি। এবার তমালকে পরিচয় করিয়ে দেই। পুরো নাম তমাল রাশেদীন। সবাই তমাল বলে ডাকে। একটা বেসরকারি কলেজ থেকে বছরতিনেক আগে বিএ পাশ করেছে। এই তিন বছরে অন্তত গোটা তিরিশেক চাকরির দরখাস্ত করেছে। কাজ হয়নি। বাবা সাহেদ রহমান গ্রামের পোস্ট অফিসে পোস্ট মাস্টার। দু-ভাইয়ের মধ্যে তমাল ছোট। বড় ভাই হীরণ একটা এনজিওতে চাকরি করে। বাড়ি থেকেই অফিস করে। সংসারের অবস্থা মোটামুটি ভালো। তমাল ছাত্র হিসেবে খুব যে ভালো ছিল তা নয়। তবে দ্বিতীয় বিভাগ পেয়েছে। ওর চেয়ে খারাপ ছাত্ররাও অনেকে ভালো চাকরি পেয়ে ভালো সময় পার করছে। অথচ তমালের ভাগ্যে এখনো চাকরি জুটছে না। কলেজে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিল তমাল। দলের বড় বড় নেতাদের সাথে তার বেশ সখ্যও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু কপাল হেলে গেলে যা হয়। তমালেরও তাই হলো। তমালের পরীক্ষার পরই ওদের দল ক্ষমতা হারায়। বিরোধী দলের ছেলেদের চাকরি পাওয়া এখন চাঁদে যাবার মতো ঘটনা। তাছাড়া চাকরির জন্য যেসব কোটা চালু রয়েছে, তমাল সেসবের আওতায়ও পড়ে না। তমালের মূলধন শুধু গোটা তিনেক সার্টিফিকেট।
তমালের বেকারত্ব নিয়ে অবশ্য পরিবারের কেউ কখনো কোন কটু কথা বলে না। ওর বাবা আর বড় ভাই অনেক বিনয়ী মানুষ। ভাবিটাও বেশ আন্তরিক। সেই তো তমালকে পকেট খরচের টাকা দেয়। কখনো সবার সামনে, আবার কখনো গোপনে। তমালও ভাবিকে যথেষ্ট সম্মান করে। পরিবারের কাছ থেকে টাকা নিলেও, ভেতরে ভেতরে অনেক লজ্জা পায় তমাল। যে সময় বাবা, মা বা পরিবারের লোকজনের হাতে টাকা তুলে দেয়ার কথা, সেই সময় পরিবারের কাছ থেকে উল্টো টাকা নিতে হয়। এটা একজন বিবেকবান মানুষের কাছে লজ্জার বিষয়ই বটে। সবার মধ্যে এই বোধ না থাকলেও, তমালের মধ্যে তা পুরোপুরিভাবেই আছে। কিন্তু অসহায়! একটা ভালো চাকরির স্বপ্ন তমালেরও আছে। নিজের চাহিদা মেটাতে কে না চায়। পাগলও নিজের জন্য কিছুটা ভাবে। নিজে আয় করে নিজের চাহিদা মেটাতেই অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। সেখানে পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে
নিজের চাহিদা মেটানো অসম্ভব ব্যাপার। নিজের প্রতি ঘৃণা নিয়েই দিন কাটায় তমাল। গত কয়েকটি ঈদে সে নতুন কাপড় নেয়নি। বাড়ি থেকে টাকা দিতে চাইলেও তমাল তা নেয়নি। কিন্তু এভাবে আর কত! গ্রামের কয়েকটি দোকানে কিছু বাঁকী হয়ে গেছে। নতুন করে আর বাঁকী দিতে চায় না দোকানীরা। কবে টাকা দিতে পারবে, তমাল নিজেও জানে না, তবুও বিড়ি বা টুকিটাকি জিনিসপত্রের প্রয়োজনে, মিথ্যা একটা দিন তারিখের কথা বলে আবারও বাঁকী নেয়। সময় কাটানোর জন্য তাসের আসরে বসলেও ছেলে হিসেবে তমাল খারাপ না। স্বভাব চরিত্র অনেক ভালো। গ্রামের কোনো লোকজনের সাথে কখনো কোন বেয়াদবি করে না। গ্রামের দুষ্ট ছেলেদের সাথে এ বাড়ি ও বাড়ির এটা ওটা চুরি করার সাথে তমাল নেই। ফলে তমালকে গ্রামের লোকজন ভালো চোখেই দেখে। তমালের গ্রাম্য অনেক বন্ধুরাই চাকরি পেয়ে শহরে থাকে। ছুটিছাটা পেলে বাড়িতে আসে। কেউ কেউ দেখা হলে তমালের হাতে দু-এক প্যাকেট সিগারেট ধরিয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ ছোটখালো জিনিসপত্রও দেয়। গত ঈদে হিজল নামের এক বন্ধু বেশ দামী কিছু জিনিসপত্র দিয়ে গেছে। কিন্তু তমালের কাছে এগুলো উপহার মনে হয় না। করুনা মনে হয়। তবুও ভদ্রতার কারণেই নিতে হয়।
গ্রামে বন্যার পানি ঢুকেছে। মাঠ-ঘাট সব তলিয়ে গেছে। নৌকা বা ভেলা ছাড়া এপাড়া ওপাড়া যাওয়া যায় না। তাসের আড্ডা বন্ধ হয়ে গেছে। বাড়িতে শুয়ে বসে আর রেডিওর সাথে কতটা সময় কাটানো যায়। তমাল কখনো কখনো হাঁপিয়ে ওঠে। সন্ধ্যার আগে কলাগাছের ভেলা নিয়ে গ্রামের বাজারে বসে কিছু সময় কাটায়। কিন্তু সেখানেও স্বস্তি নেই। গ্রামের নানা মানুষের নানা কথাÑ ‘বাপের হোটেলে আর কয়দিন খাবা বাপু, একটা চাকরি বাকরি জোগাড় করো। এইভাবে আর কয়দিন চলবা। বাপ মরলে ঠিকই বুঝবা।’ এসব কথা আগে সহ্য হলেও, এখন মৌমাছির হুলের মতো শরীরে বিঁধে পড়ে। কিছু বলা যায় না। কোন কর্ম না থাকায় তাস খেললেও নিজের বিবেক বা বোধ শক্তি হারায়নি এখনো। তাই মুরুব্বিদের এমন কথায় কোন প্রতিউত্তর করে না। গ্রামের অন্য কোন ছেলে হলে ঠিকই একটা জবাব দিয়ে দিতো। রাতে শুয়ে শুয়ে নিন্দ্রহীন চোখে জীবনের হিসাব মেলাতে চেষ্টা করে তমাল। কখনো ভাবে চাকরির আশা ছেড়ে, গ্রামে একটা ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করবে। কিন্তু এর জন্য যে টাকা কড়ি লাগবে, তমালের পরিবার থেকে তা জোগাড় করা অনেক কঠিন। এসব চিন্তা তমালকে সব সময় তাড়া করে বেড়ায়। বেকারত্ব নিয়ে মানুষের নানা কথা শুনতে হবে বলে, খুব বেশি দরকার ছাড়া তমাল বাইরেও যায় না। শুক্রবারে জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাজারের কোনায় দেখা হয় লাভলুর সাথে। লাভলু তমালের বন্ধু। গ্রামের প্রাইমারিতে শিক্ষকতা করে। গ্রামে থাকলেও তমালের সাথে দেখা সাক্ষাত হয় খুবই কম। দু-এক কথা বিনিময়ের পর লাভলু হাত উঁচিয়ে সামনের একটা ঘর দেখিয়ে বলে- বিকালে আসিস আমাদের সমিতির
উদ্বোধন উপলক্ষ্যে মিলাদ হবে। তমাল ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে, বারান্দার উপরে সাইনবোর্ড ঝুলানো। সাইনবোর্ডে লেখাÑ ‘কৃষ্ণনগর চাকরিজীবি সমিতি।’ তমালের মুখে কোন কথা নেই। গ্রামের বন্ধুরা আজ সমিতি করছে, যেখানে তমাল রাশেদীনের থাকার যোগ্যতা নেই। লাভলুকে কিছু না বলেই তমাল বাড়ির রাস্তা ধরে। রাস্তার পাশে বিশাল মাঠে বন্যার পানি। দক্ষিণা বাতাসে ঢেউ আঁছড়ে পড়ছে কিনারে। একেকটি ঢেউ যেন তমালের হৃদয় ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। তমাল নির্বিকার, দৃষ্টি উদাস...