রবিবার, মে ১৭, ২০২৬

রাষ্ট্রায়ত্ত ৫০ পাট-বস্ত্রকলের মাত্র ৯টিতে ঘুরছে চাকা

সোনার দেশ ডেস্ক ১৬ মে ২০২৬ ০২:০৩ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ১৬ মে ২০২৬ ০২:০৩ অপরাহ্ন
রাষ্ট্রায়ত্ত ৫০ পাট-বস্ত্রকলের মাত্র ৯টিতে ঘুরছে চাকা
বিজেএমসি এবং বিটিএমসি নিয়ন্ত্রণাধীন কলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে/ছবি: এআই নির্মিত

একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত পাট ও বস্ত্রকলগুলোর কর্মচাঞ্চল্য ঘিরে মুখর ছিল দেশের নানা শিল্পাঞ্চল। সেই দিন গত হয়েছে অনেক আগেই। লোকসানের ভার বইতে না পেরে সরকার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কারখানাগুলোর চাকা। যেখানে পড়ে আছে শত শত একর জমিসহ নানা স্থাপনা। এখন সেগুলো লিজ বা ইজারা দিয়ে বেসরকারিভাবে পুনরায় চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে এই ইজারার উদ্যোগ একযুগ আগে নেওয়া হলেও দীর্ঘসূত্রতায় এতদিনেও কার্যক্রমটি খুব বেশি হালে পানি পায়নি। তথ্য বলছে, বন্ধ ৫০টি মিলের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র নয়টির চাকা বেসরকারি উদ্যোগে ফের সচল করতে সামর্থ্য হয়েছে সরকার। আরও কয়েকটি মিল ইজারা হলেও এখনো সেগুলো চালু হয়নি। আবার দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে তিনটি প্রতিষ্ঠান ইজারা নেওয়া পাটকল চালাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। তাদের ইজারা এরই মধ্যে বাতিল হয়েছে।

মিল ইজারার সূত্রপাত

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শুরুতে বস্ত্রকল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় ২০১৪ সালে, আর পাটকল ২০২০ সালে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব মিলের মধ্যে ঢিলেঢালাভাবে কিছু ইজারা দেওয়াও হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ে ইজারা দেওয়ার চেষ্টা করেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব কারখানা বেসরকারি খাতে দেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে। তারা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া নিয়েছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, দেশের সব বন্ধ বস্ত্র ও পাটকল পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় সচল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেসরকারি খাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান। এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পকারখানার ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে।

কোন সংস্থার কত মিল ইজারা

পাটকল করপোরেশনের আওতায় মোট কল রয়েছে ২৫টি। এর মধ্যে ইজারার জন্য নির্বাচন করা হয় ২০টি। সেখানে এখন পর্যন্ত ১৪টি বেসরকারি খাতে ইজারায় গেছে। তবে এ পর্যন্ত চালু হয়েছে অর্ধেক, অর্থাৎ সাতটি। অন্য সাতটি চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে দাবি বিজেএমসির। তবে এসব নিয়ে রয়েছে নানা জটিলতা; অর্থাৎ মিলগুলোর চাকা এখনো ঘোরেনি।

নির্বাচিত বাকি ছয়টি মিল এখন ইজারা দিতে চায় করপোরেশন। সেগুলোর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, তাদের ইজারা কার্যক্রমবহির্ভূত পাঁচটি মিলের মধ্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের এলাকাভুক্ত দুটি মিল বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে। একটি মিল ইজারার তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব বিবেচনাধীন আর দুটি মিল মামলাজনিত কারণে ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না।

টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের ২৫ মিলের মধ্যে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় উৎপাদন চালু রয়েছে মাত্র দুটিতে। আরও দুটি মিল ইজারার মাধ্যমে চালুর জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

বিটিএমসি আরও ১৬টি মিল পিপিপি অথবা ইজারা পদ্ধতিতে বেসরকারি খাতে দিতে চায়। বাকিগুলোর মধ্যে একটি টেক্সটাইল পল্লি স্থাপনের জন্য এবং একটি টেক্সটাইল থিম পার্ক স্থাপনের জন্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনটি মিল নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান। তাই সেগুলো নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ দীর্ঘ প্রচেষ্টায় এখন পর্যন্ত দুটি কারখানা উৎপাদনে ফিরতে পেরেছে।

দেশের সব বন্ধ বস্ত্র ও পাটকল পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় সচলর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেসরকারি খাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান। এরই মধ্যে কয়েকটি শিল্পকারখানার ইজারার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চলছে।- বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম

বেসরকারি খাতে যাওয়া পাটকলগুলো

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ইজারা দিয়ে চালু করা সাতটি পাটকলের মধ্যে চারটিতে পাটজাত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। অন্য তিনটিতে হচ্ছে সোয়েটার, জুতা, ছাতা, তাঁবু ও স্পেয়ার পার্টস। এসব মিলে এখন কাজ করছেন ৯ হাজার ৫২০ জন শ্রমিক-কর্মচারী।

যে চারটি পাটকলে এখন শুধু পাটজাত পণ্য উৎপাদন হচ্ছে সেগুলোতে দৈনিক ১৬০ টন পণ্য তৈরি হয়। এ থেকে বর্তমানে বছরে ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পাটপণ্য উৎপাদনে রয়েছে এমন মিলগুলো হলো- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেড পরিচালিত বাংলাদেশ জুট মিলস, আকিজ জুটের যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, রিগাল জুট লিমিটেডের কার্পেটং জুট মিলস ও আটলান্টিক জুট লিমিটেডের ইস্টার্ন জুট মিলস।

ভিন্ন পণ্য উৎপাদনে যারা

ইউএমসি জুট মিল ইজারা নিয়ে এখন সেটি পোশাক কারখানায় রূপান্তর করেছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেস্ট সোয়েটার লিমিটেড। তারা সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে সোয়েটার উৎপাদন করছে। এতে কাজ শুরু করেছেন প্রায় ৩০০ শ্রমিক।

পাট-বস্ত্রকল; পঞ্চাশের মধ্যে নয়টির চাকা ঘুরছেরাজশাহী টেক্সটাইল মিলসে উৎপাদিত ট্রলি ব্যাগ ও চামড়াজাত পণ্য দেখছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের প্রতিনিধিদল/ফাইল ছবি

রাজশাহী জুট মিলস ইজারা নিয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান বঙ্গ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেড। তাদের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন এক হাজার ৩০০ জন। সেখানে দৈনিক প্রায় পাঁচ হাজার জোড়া জুতা, এক হাজার ৩০০ পিস ছাতা এবং প্রায় ৪০০ পিস তাঁবু উৎপাদন হচ্ছে।

এছাড়া, গালফ্রা হাবিব লিমিটেডের ইজারা নেওয়া মিলে শফি মোটরস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন ১৪০ কেজি স্পেয়ার পার্টস উৎপাদন করছে।

এসব প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা মামনুর রশিদ জাগো নিউজকে বলেন, ইজারা নেওয়া এসব প্রতিষ্ঠান প্রথম ৩০ মাস সময় পেয়েছে মেশিনারি স্থাপন, কারখানা আধুনিকায়নসহ অন্যান্য কার্যক্রম গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। এর মধ্যে যেসব মিল চালু হয়েছে, তারা শুরু থেকে খুব ভালো করছে। একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। রপ্তানিতেও বড় অবদান রাখছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

পিপিপির আওতায় চলছে দুটি বস্ত্র মিল

বর্তমানে পিপিপির আওতায় উৎপাদন চালু রয়েছে বিটিএমসির ইজারা দেওয়া দুটি মিলের। সেগুলো হলো আহমেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিলস এবং রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস। এছাড়া ভালিকা উলেন মিলস ও সিলেট টেক্সটাইল মিলস দুটি ইজারার মাধ্যমে চালু করার জন্য নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে এখনো চালু হয়নি।

আহমেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিল চালাচ্ছে তাঞ্জিনা ফ্যাশন। প্রতিষ্ঠানটি ২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী দিয়ে সেখানে রপ্তানিমুখী ডেনিম জিন্স ও সোয়েটার উৎপাদন করছে। এ কারখানার কার্যক্রম দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে, রাজশাহী টেক্সটাইল মিল চালাচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সেখানে এখন পর্যন্ত কর্মসংস্থান হয়েছে দুই হাজার। তৈরি করা হচ্ছে ট্রলি ব্যাগ ও চামড়াজাত পণ্য।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজশাহী টেক্সটাইলের কারখানাটি হবে একটি টেকসই পরিবেশবান্ধব শিল্প পার্ক। এখানে উৎপাদিত পণ্য হবে শতভাগ রপ্তানিমুখী। এছাড়া এখানে নারীদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে টেলি মার্কেটিংসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে।

তথ্যসূত্র: জাগোনিউজ