রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

পদ্মা পার হয়ে নিতে হয় চিকিৎসা, জীবনের ঝুঁকিতে ৫ হাজার মানুষ

আমানুল হক আমান, বাঘা ৩০ মে ২০২৬ ০১:৩৮ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
আমানুল হক আমান, বাঘা ৩০ মে ২০২৬ ০১:৩৮ অপরাহ্ন
পদ্মা পার হয়ে নিতে হয় চিকিৎসা, জীবনের ঝুঁকিতে ৫ হাজার মানুষ

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চকরাজাপুর ইউনিয়ন। এই ইউনিয়নের মধ্যে আতারপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ড চৌমাদিয়া ২ নম্বর ওয়ার্ড, ও দিয়ারকাদিরপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ড। পদ্মার বুকজুড়ে বিস্তীর্ণ এই তিনটি ওয়ার্ডে বসবাস ৫ হাজার মানুষের।


তিনটি ওয়ার্ডের মানুষ বছরের পর বছর ধরে বসবাস করলেও সেখানে নেই কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নেই জরুরি চিকিৎসাসেবা। অসুস্থ হলে মানুষের একমাত্র ভরসা গ্রাম্য চিকিৎসক। জটিল রোগ বা গর্ভবতী নারীদের নিয়ে ছুটতে হয় ৩০ কিলোমিটার দূরে উপজেলা সদর বা ৮০ কিলোমিটার দূরে রাজশাহী শহরে।


সেই পথ সহজ নয়, পাড়ি দিতে হয় পদ্মা নদী ও দুর্গম চর। বর্ষা মৌসুমে নৌকাতে সহজে চলাচল করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশাল চর পাড়ি দিয়ে পায়ে হেঁটে আবার নৌকায় পারাপার হতে হয়। এছাড়া যাতায়াতে দফায় দফায় দিতে হয় টোল। চরবাসী যেদিকে যান, সেদিকে টোল দিতে হয়। 


স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এই চরের মানুষের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র। ফলে প্রসূতি মা, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মাঝরাতে কেউ অসুস্থ হলে, যেন কোনো উপায় থাকে না তিনটি ওয়ার্ডবাসীর। বর্ষাকালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীতে স্রোত বাড়লে রোগী নিয়ে পারাপার করাটা হয়ে পড়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।


আতারপাড়পা চরের ছলেমান আলী বলেন, বাড়িতে অসুস্থ মা আছে। রাতে অসুস্থ হলে বুক ধড়ফড় করে। কখন নৌকা পাবো, চর পার হবো কিভাবে, কখন হাসপাতালে পৌঁছাবো-এই চিন্তায় থাকি। অনেক সময় পথে, এ চর থেকে যাওয়ার সময় রোগী মারা যায়।”


চৌমাদিয়া চরের সোহেল রানা বলেন, চরের মানুষ মূলত কৃষিকাজ ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল। চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে হলে যাতায়াত খরচ অনেকের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে গ্রাম্য চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা নেয়। কিন্তু জটিল রোগের ক্ষেত্রে সেটি যথেষ্ট নয়।


দিয়াড়কাদিপুর চরের বেল্লাল হোসেন বলেন, একদিন রাতে মালেক আলী ব্যাপারীর মেয়ে সেলিনা বেগমের প্রসব বেদনা উঠেছিল। মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসলো। দুই-তিনজন মিলে কোলে করে নৌকা পর্যন্ত নিয়ে গেলাম সেলিনাকে। এরমধ্যে নৌকাতে বাচ্চা হয়ে গেলো। কিন্তু প্রচুর পরিমাণ রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিল। এরপর পদ্মা নদী পার হয়ে ঘাটে নামানো হলো। এই ঘাট থেকে কাঁধে করে ঝুলিয়ে অটোরিকশাতে করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্্ের নিয়ে যাওয়া হয়। অল্পের জন্য মেয়েটি প্রাণে বেঁচেছে। আর একটু দেরি করলে আর বাঁচানো যেতো না।


চৌমাদিয়া চরের গ্রাম্য চিকিৎসকের মাসুম মোল্লা বলেন, আমরা চেষ্টা করি সাধারণ চিকিৎসা দিতে। কিন্তু হার্টের রোগী, স্ট্রোক বা প্রসূতি জটিলতা হলে কিছু করার থাকে না। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়। কিন্তু দুর্গম চরের কারণে সময়মতো নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে অনেকে রাস্তায় মারা যায়। আবার যেতে যেতে কেউ সন্তান প্রসব করে।


চকরাজাপুর ইউনিয়নের আতারপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বর আবদুর রহমান দর্জি বলেন, আমরা খুব চেষ্টা করছি, এখানে কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য। কিন্তু এখনো সেটি পাইনি। বছরের পর বছর ধরে এই তিনটি ওয়ার্ডের ৫ হাজার মানুষ কোনো স্বাস্থ্যসেবা পায় না। তাঁদের একমাত্র ভরসা গ্রামীণ ডাক্তার। তারা আবার পশুর চিকিৎসা করেন। এরপর মানুষ বাধ্য হয়ে ওদের কাছে যান। যাওয়ার তো কোনো জায়গা নাই। চরের মানুষদের ধাপে ধাপে দিতে হয় টোল। এরপর আছে নৌকা ভাড়া। সাথে কোনো মালামাল থাকলে তার ভাড়া দিতে হয়। অনেক মানুষ এই পারাপারের টাকা দেয়ার ভয়ে শহরের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান না।


আবদুর রহমান দর্জি আরও বলেন, চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়ারকাদিরপুর চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ড। এরমধ্যে ১ নম্বর আতারপাড়ায় ভোটার সংখ্যা ৩৭৩। ২ নম্বর ওয়ার্ড চৌমাদিয়ায় ভোটার সংখ্যা ৫৫৬। ৩ নম্বর ওয়ার্ড দিয়ারকাদিরপুর ভোটার সংখ্যা ৯৮৭। এই তিনটি ওয়ার্ডে পরিবার রয়েছে ৭৫০টি। তিনটি ওয়ার্ডে জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০ জন। এ তিনটি চরে মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নেই কোন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্টান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র। 


এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকলল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, চকরাজাপুর ইউনিয়নে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছিল। এরমধ্যে একটি পদ্মাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। একটির কাজ চলমান রয়েছে। তবে চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়ারকাদিরপুরে কোন কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবগত করা আছে। এছাড়া চকরাজাপুর ইউনিয়নে পদ্মা গর্ভে বিলীন হওয়া কমিউনিটি ক্লিনিকটি পুনরায় চালু করা ও একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।