শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

মুক্তির অমর ইশতেহার : ৩০ জুনের হুল এবং আজকের বাংলাদেশ

মিথু শিলাক মুরমু ২৯ জুন ২০২৬ ১১:০৯ অপরাহ্ন মতামত
মিথু শিলাক মুরমু ২৯ জুন ২০২৬ ১১:০৯ অপরাহ্ন
মুক্তির অমর ইশতেহার : ৩০ জুনের হুল এবং আজকের বাংলাদেশ

ইতিহাসের কিছুদিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সাধারণ অনুষঙ্গ নয়, বরং শোষিতের বুকে জ্বালিয়ে রাখা এক চিরন্তন মশাল। তেমনই একটি দিন ৩০ শে জুন, মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে, রাজমহল পাহাড়ের পাদদেশে ভগনাডিহির মাঠে সমবেত হয়েছিলেন প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল মুক্তিকামী মানুষ। সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব আর দুই অকুতোভয় বোনফুলো ও ঝানো মুরমু’র নেতৃত্বে বেজে উঠেছিল‘ হুল’ বা মহাবিদ্রোহের দামামা।


ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক, অত্যাচারী জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের সম্মিলিত শোষণের বিরুদ্ধে তা ছিলো উপমহাদেশের বুকে মেহনতি মানুষের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম। সেই লড়াইয়ের পর দুই শতকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেছে। আজ ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এই স্বাধীন বাংলাদেশের দাঁড়িয়ে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে হয়Ñসাঁওতাল হুল-এর সেই মূল চেতনা কি আমরা আমাদের রাষ্ট্রে ধারণ করতে পেরেছি? ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তা কালে দেখা যায়, সাঁওতালরা কোনো পররাজ্য জয় বা ক্ষমতার লোভে তীর-ধনুক হাতে তুলে নেননি।


তাদের লড়াই ছিলোÑ জল-জঙ্গল আর নিজেদের রক্ত-ঘামে ঊর্বর করা পৈতৃক ভূমির অধিকার রক্ষার লড়াই। সরল-সোজা আদিবাসীদের চড়া সুদের ঋণের জালে আটকে যখন দাস বানানো হচ্ছিল, মা-বোনদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হচ্ছিল, তখন তারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। আধুনিক রাইফেল আর কামানের গোলার সামনে বুক পেতে দিয়ে ছিলেন হাজার হাজার আদিবাসী সাঁওতাল। এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ব্রিটিশরা তাদের বীরত্বের কাছে নতি স্বীকার করে ‘সাঁওতাল পরগনা’নামক পৃথক জেলা গঠন করতে এবং সাঁওতালদের অধিকার রক্ষায় বিশেষ আইন তৈরি করতে বাধ্য হয়েছিলো।


স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকেও এই লড়াকু জাতির রক্ত মিশে আছে। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনে কমরেড ইলামিত্রের পাশে থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতাল কৃষকরাই সম্মুখ সমরে বুক পেতে দিয়েছিলেন। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মহান মুক্তিযুদ্ধে উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল যুবকেরা তীর-ধনুক নিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের আধুনিক অস্ত্রের মুখোমুখি হয়েছিলেন, শহীদ হয়েছেন অনেকে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলোÑ যে স্বাধীনতার জন্য তারা বারবার রক্ত দিলেন, সেই স্বাধীন রাষ্ট্রেই আজ সমতলের এই আদিবাসীরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও প্রান্তিক। প্রতিবছর ৩০ শে জুন আমরা ধামসা-মাদলের ছন্দে, সিধু-কানুর বেদীতে ফুল দিয়ে হুল দিবস পালন করি কিন্তু উৎসবের এই চাকচিক্য কি তাদের হৃদয়ের ভেতরের কান্না ঢাকতে পেরেছে? বর্তমান বাংলাদেশে সাঁওতালদের প্রধান সমস্যা ও সংকট হলোÑভূমি।


পৈতৃক জমি থেকে উচ্ছেদ, প্রভাবশালী ভূমিগ্রাসীদের থাবা আর রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের নামে ভূমি কেড়ে নেওয়ার ঘটনা তাদের প্রতিনিয়ত যাযাবরে পরিণত করছে। ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের চিনিকলের জমিতে তিন সাঁওতাল হত্যার দগদগে ক্ষত আজ এক দশক পরও সমতলের আদিবাসীদের অরক্ষিত বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দেয়। শুধু ভূমি নয়, হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতিও। প্রাথমিক স্তরে নিজস্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারের দাবিটি আজও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। দীর্ঘকাল ধরে সমতলের আদিবাসীদের জন্য একটি পৃথক ‘ভূমি কমিশন’গঠন এবং তাদের‘ আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে, সেখানে সাঁওতালদের মতো বীরের জাতিকে পেছনে ফেলে রাখা চরম স্ববিরোধিতা।


৩০শে জুনের ‘হুল দিবস’ কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা বা আদিবাসী সংস্কৃতির প্রদর্শনী নয়; এটি রাষ্ট্র ও মূলধারার মানুষের জন্য এক গভীর অনুস্মারক। সিধু-কানু, ফুলো-ঝানোর রক্তের ঋণ শোধ করার একটাই উপায় স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সাঁওতালদের ভূমি, ভাষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক মর্যাদা সুনিশ্চিত করা। যেদিন সমতলের প্রতিটি আদিবাসীÑসাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, কোডা, রাজোয়াড়, তুরী’রা নিজের ভিটেমাটিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন, সেদিনই কেবল পূর্ণতা পাবে ৩০ জুনে রহুল-এর অমর ইশতেহার।