শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬

রাজশাহীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় দূষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:২৮ অপরাহ্ন বিশেষ প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৩ আগস্ট ২০২৬ ১১:২৮ অপরাহ্ন
রাজশাহীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় দূষণ

২০১৬ সালে পরিচ্ছন্ন আর বাসযোগ্য নগরীর খেতাব পেয়েছিল রাজশাহী। ১০ বছর পরে এসে সে খেতাব ম্লান হতে লেগেছে। এখন ‘দূষণের নগরী’ পরিণত হতে চলছে। নগরীতে যত্রতত্র ময়লা ফেলা, ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং দূষণের ছোবলে হারাতে বসেছে নগরীর সৌন্দর্য। এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে রাজশাহী বিনোদনকেন্দ্রগুলো। রাজশাহীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে অস্বাস্থ্যকর মাত্রায় দূষণ পাওয়া গেছে।  


‘রাজশাহী নগরীর বিনোদনমূলক স্থানসমূহের বায়ুর গুণমান: আদর্শ একিউআই মাত্রা অতিক্রমকারী পার্টিকুলেট ম্যাটার ও গ্যাসীয় দূষক বিষয়ক একটি সমীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণা প্রকাশ হয়েছে। জুলাই মাসের ২৩ তারিখে এই গবেষণা প্রকাশ করে নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক স্প্রিংগার জার্নাল। 


গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর নগরীর পার্ক, নদীর তীরবর্তী এলাকা এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক স্থানে তাজা বাতাস বা শরীরচর্চার জন্য যাওয়া মানুষজন অস্বাস্থ্যকর মাত্রার পার্টিকুলেট দূষণের সংস্পর্শে আসছেন। জরিপকৃত ১৫টি স্থানের সবকটিতেই পিএম২.৫-এর ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অতিক্রম করেছে।


রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই জরিপ করেন। এই সমীক্ষাটি ২০২৫ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে রাজশাহী নগরীর ১৫টি জনপ্রিয় বিনোদনমূলক স্থানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেখানে দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ ভিড়ের সময়ে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পাশাপাশি পিএম২.৫, পিএম১০, পিএম১.০, ফর্মালডিহাইড এবং মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগ পরিমাপ করা হয়েছে।


বাংলাদেশের জাতীয় পরিবেষ্টিত বায়ুর গুণমান মানদণ্ড এবং মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী রাজশাহীর নগরীর পদ্মা গার্ডেন, শহিদ জিয়া শিশু পার্ক, রাজশাহী কেন্দ্রীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা, মুক্তমঞ্চ, গোদাগাড়ীর সরমংলা ইকো পার্ক এবং সাফিনা পার্কÑএই ছয়টি স্থানকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।


রাজশাহী নগরীর পদ্মা গার্ডেনে পিএম২.৫, পিএম১০ এবং পিএম১.০-এর সর্বোচ্চ ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ১০৫, ১৩৫ এবং ৭০ মাইক্রোগ্রাম রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমিতে সর্বনিম্ন মাত্রা যথাক্রমে ১১, ১৪ এবং ৬ মাইক্রোগ্রাম রেকর্ড করা হয়েছে। স্থানগুলোতে বায়ু গুণমান সূচকের স্কোর ১৩ থেকে ১৭৭ পর্যন্ত ছিল, যেখানে পিএম২.৫, পিএম১০ এবং পিএম১.০-এর গড় ঘনত্ব যথাক্রমে প্রতি ঘনমিটারে ৪৯.২৪, ৬১.১১ এবং ৩৩.২২ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া গেছে।


বিনোদন কেন্দ্রগুলো ব্যস্ত হয়ে ওঠার সাথে সাথে দূষণের মাত্রা বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বিকেল ৪টা, ৫টা এবং ৬টায় নেওয়া পরিমাপগুলোতে পিএম২.৫ এবং পিএম১.০-এর মানে পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে, এবং বেশিরভাগ স্থানেই বিকেল ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে এর ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে।


গবেষকরা খাবারের দোকান এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে মানুষ ও যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধির কারণে দূষণের কথা বলছেন। 


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, বিনোদনমূলক স্থানগুলোর ভেতরের দূষণের জন্য ভেতরের কার্যকলাপকেই দায়ী করা যায় না। বাতাসের দিক এবং ঋতুগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে পিএম২.৫ ও পিএম১০ পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বাহিত হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে জমা হতে পারে।


বায়ু দূষণ সমস্যার জন্য অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন এবং সবুজ স্থান ও জলাশয়ের সংকোচনকে দায়ী করেন এই অধ্যাপক তিনি বলেন, রাজশাহীতে সম্প্রতি সড়ক, ফ্লাইওভার ও ভবন নির্মাণসহ দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে প্রচুর পরিমাণে ধূলিকণা ও সূক্ষ্ম কণা উৎপন্ন হয়। 


গবেষণাটির প্রধান লেখক এবং রুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া তাবাসসুম বলেন, পৃথক পৃথক স্থানে সম্ভাব্য দূষণের উৎসগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলো আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। নগরীর পদ্মা আবাসিকে অবস্থিত আরডিএ পার্কের পাশের রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী বাসগুলোর ধোঁয়া সরাসরি পার্কটিতে প্রবেশ করে। আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে, ওই এলাকায় কঠিন বর্জ্য সঠিকভাবে ফেলা হচ্ছিল না। পার্ক থেকে দেড়শ মিটার দূরেই ময়লার ফেলার স্থান আছে। সেখানে আশেপাশের এলাকা থেকে বর্জ্য নিয়ে এসে ফেলা হচ্ছে।  


তিনি আরও বলেন, গবেষণায় পিএম২.৫, পিএম১০ এবং পিএম১.০-এর মধ্যে শক্তিশালী পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যা থেকে বোঝা যায় যে এই কণা দূষকগুলোর উৎস একই হতে পারে, অন্যদিকে ফর্মালডিহাইড এবং মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগ ভিন্ন ভিন্ন দূষণ ধরণ দেখিয়েছে।


এই গবেষণায় কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন এবং সালফার ডাইঅক্সাইডসহ বেশ কিছু দূষক পরিমাপ করা হয়নি। সুমাইয়া বলেন, প্রাপ্ত ফলাফল ব্যাখ্যা করার সময় ঋতুগত পরিবর্তনগুলো বিবেচনা করা উচিত। প্রতিটি স্থানের নির্দিষ্ট দূষণের উৎসগুলো এখনও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।


সমীক্ষায় ব্যস্ততম সময়ে অধিক ব্যবহৃত বিনোদন কেন্দ্রগুলোর আশেপাশে যান চলাচল সীমিত, ধুলোবালি দমন এবং ঘন ও বহুস্তরীয় গাছপালার প্রতিবন্ধক তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। তারা বায়ুর গুণমানের নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ এবং এনও২, সিও, ও৩ এর পর্যবেক্ষণসহ আরও বিশদ উৎস বিশ্লেষণেরও আহ্বান জানিয়েছেন।