বগুড়ায় উৎপাদন বেড়েছে, বিপ্লবের সাফল্যে বাধায় ভেজাল ফিড
সবুজ শ্যামলে ঘেরা উত্তরবঙ্গের শস্যভাণ্ডার বগুড়া। এখানকার দিগন্তজোড়া মাঠে যেমন সবজী সহ বিভিন্ন ফসলের সমাহারে খ্যাতি রয়েছে। তেমনি জেলার জলাশয়গুলোতে এখন রূপালী মাছের স্বপ্ন বোনা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি আর মৎস্যচাষীদের নিরলস শ্রমে জেলার ১২টি উপজেলার জলাশয়গুলোতে লেগেছে রূপালী বিপ্লবের হাওয়া। বগুড়ার বুক চিরে উৎপাদিত সেই মাছ কেবল স্থানীয় তৃপ্তিই মেটাচ্ছে না, সমুদ্রের রূপালী ঢেউয়ের মতো তা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের এক জেলা থেকে অন্য জেলায়। তবে মৎস্য উৎপাদনের এই উজ্জ্বল সাফল্যের রূপকথার পেছনে জমাট বেঁধেছে কিছু না-বলা আক্ষেপ আর অনিশ্চয়তা।
উৎপাদনের এই ধারাবাহিকতায় প্রতিবন্ধকতায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেজাল মাছের খাবারের (ফিড) বিষাক্ত থাবা আর খামার উপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। আর সবচেয়ে বড় শূন্যতা -প্রান্তিক চাষীদের নিজের উৎপাদিত খাবারের মান পরীক্ষা করার কোনো স্থানীয় ল্যাব তাদের হাতের নাগালে নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলায় মাছ চাষযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি মিলে ৬০ হাজার ৯৪৯টি পুকুর ও দিঘী রয়েছে। নদ-নদী ১৫টি ও বিল রয়েছে ৮১টি। তা ছাড়াও সরকারি মৎস্যবীজ উৎপাদনের জন্য ২টি খামার , বেসরকারি ১৬৩টি হ্যাচারী এবং ৩৬১টি বেসরকারি নার্সারী থেকে উৎপাদিত পোনা মাছ চাষে যোগান দিয়ে থাকে। গত ২০২২ সালের আদমশুমারী অনুসারে জেলার মোট জনসংখ্যা ৩৭ লাখ ৩৪ হাজার জন।
এ জেলার মানুষের প্রতিদিন জনপ্রতি ৬২ গ্রাম হিসেবে বার্ষিক মাছের চাহিদা ৮৪ হাজার ৫০৫ মেট্রিক টন। এদিকে গত ২০২২- ২৩ অর্থ বছরে মাছের উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে মোট মাছের উৎপাদন হয় ১ লাখ ৪ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে উৎপাদন হয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৩৫১ মেট্রিক টন মাছ। আর চলতি বছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৬৪৮ মেট্রিক টন মাছ। ফলে গত ৪ বছরে এ জেলার চাহিদার তুলনায় গড়ে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার ১৪৩ মেট্রিক টন মাছ উদ্বৃত্ত থাকে। এই উদ্বৃত্ত মাছ জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য জেলায় প্রেরণ করা হয়ে থাকে।
আদমদীঘির মেসার্স জিএম মৎস্য খামারের স্বত্বাধিকারী আব্দুল মহিত তালুকদার জানান, সাফল্যের এই স্রোতের মধ্যেও খামারিরা চরম ক্ষতির মুখে। গত ২০-২২ বছরে খৈল, চুন, রাইস পালিশ ও বিদ্যুতের দাম কয়েক গুণ বাড়লেও মাছের (বিশেষ করে পাঙ্গাস) বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। উপরন্তু, ভেজাল ফিডের কারণে উৎপাদনে ধস নেমে অনেক চাষী নিঃস্ব হয়ে ব্যাংক ঋণে জর্জরিত হচ্ছেন। এ ভাবে চলতে থাকলে আগামিতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ময়মনসিংহ ও যশোরের চাষীরা খাদ্য পরীক্ষার ল্যাব সুবিধা পেলেও বগুড়ার চাষীদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ময়মনসিংহের ল্যাবের ওপর নির্ভর করতে হয়। জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফি দিয়ে হলেও দ্রুত একটি পরীক্ষাগার স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
এ অবস্থায় বগুড়ার মৎস্য চাষীদের সহযোগিতা করতে খুব শীঘ্র বগুড়ায় একটি পরীক্ষাগার নির্মাণ জরুরী। কারণ এসব ফিস ফিড পরীক্ষার জন্য বগুড়ার ব্যবসায়ীদের ময়মনসিংহ জেলায় অবস্থিত ল্যাবের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।
আর এ কারণে বগুড়ায় একটি ল্যাব তৈরি করলে আমরা তাৎক্ষনিক পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে কোন ফিড ব্যবহার করবো তা দ্রুত সিন্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে বগুড়া জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়েও ল্যাবটি চালু করা হলে মৎস্যচাষীরা ফি দিয়েও পরীক্ষা করতে রাজি আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক শারমিন আক্তার জানান, সীমিত জমিতে মাছের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ধরে রাখতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো অত্যন্ত জরুরি।
বগুড়া জেলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. খালেকুজ্জামান বলেন, “যেহেতু চাষের জমি আর বাড়ানো সম্ভব নয়, তাই সৌর প্যানেলের সাহায্যে বিদ্যুতের ঘাটতি মিটিয়ে অল্প জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।” পাশাপাশি মাছের রোগব্যাধি নির্ণয়ে একটি ‘ডিজিস ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি’ স্থাপনের প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।