শুক্রবার, আগস্ট ২১, ২০২৬

রাজশাহীতে ফ্লাইওভার নির্মাণ: প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, খানাখন্দে দুর্ভোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৪৬ অপরাহ্ন বিশেষ প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১১:৪৬ অপরাহ্ন
রাজশাহীতে ফ্লাইওভার নির্মাণ:  প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, খানাখন্দে দুর্ভোগ
ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে সড়ক এখন খানাখন্দে ভরা। এই সড়কে এসে নষ্ট হয়ে গেছে একটি সিএনজি। যা চলছে মেরামতের কাজ। ছবিটি গেল শনিবার নগরীর কলাবাগান এলাকা থেকে তোলা।

গেল কয়েক বছরে ধীরগতিতে কাজ চলছে রাজশাহী মহানগরীর চারটি ফ্লাইওভারের কাজ। এরপ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল এ বছরের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও একটি প্রকল্পও শেষ হয়নি। সড়ক বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়ছেন নগরবাসী। এছাড়াও ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজে জন্য সড়কগুলো খানাখন্দে ভরে আছে।  


নগরবাসীর অভিযোগ, কাজের ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল তদারকির কারণে উন্নয়ন প্রকল্প এখন জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্ষায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের নিচের সড়কগুলো কাদা ও গর্তে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। অন্যদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের দাবি, বিল জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই তিনটি ফ্লাইওভার উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে।


রাসিক সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিকে মহানগরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে যানজট নিরসনে ৫৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মধ্যে রায়পাড়া ফ্লাইওভারের ব্যয় ৮৬ কোটি ১৯ লাখ, বন্ধগেটে ৯৭ কোটি ৭০ লাখ, বিলশিমলায় ৮৭ কোটি ৩০ লাখ এবং শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরে সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভারের ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।


তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ শেষের নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত, আর সবচেয়ে বড় প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। এতে প্রায় দেড় বছর ধরে চলা খোঁড়াখুঁড়ি, বিকল্প সড়কে যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা ও বৃষ্টির পানিতে জমে থাকা কাদায় নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।


সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফ্লাইওভারটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি দিয়েছেন।


সরেজমিনে দেখা যায়, বিন্দুর মোড় থেকে থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত ফ্লাইওভারের কাজ এখনও পিলার নির্মাণ পর্যায়ে রয়েছে। কাজের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে আংশিক বন্ধ থাকায় রেলগেট এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই তীব্র যানজট তৈরি হচ্ছে।


এই এলাকার ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, এখানকার নির্মাণ কাজ খুব ধীরগতিতে চলছে। আমাদের ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে। প্রায় ৬ মাস থেকে ব্যবসা নেই বললেই চলে। 


ব্যাটারিচালিক ইজিবাইকচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, বছরের পর বছর ধরে কাজ চলছে। রাস্তায় গর্ত আর ভাঙাচোরার কারণে প্রায়ই গাড়ি নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত কাজ শেষ করে রাস্তা ঠিক করার দাবি জানাই। রিকশাচালক শুকুর আলী বলেন, আগে রাজশাহীর রাস্তা ভালো ছিল। এখন বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। গত সপ্তাহে গর্তে পড়ে আমার রিকশা নষ্ট হয়েছে। প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে।


রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাজশাহীতে এত বড় ফ্লাইওভারের প্রয়োজন ছিল কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন। উন্নয়নের নামে মানুষকে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বন্ধগেট এলাকার বাসিন্দা সজীব ভূইয়া বলেন, এক কিলোমিটার পথ যেতে এখন তিন কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে সময় ও জ্বালানি দুই-ই নষ্ট হচ্ছে।


বহরমপুর এলাকার বাসিন্দা অরুণ মণ্ডল বলেন, ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলাচল এমনিতেই কষ্টকর। বর্ষায় তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বন্ধগেট ফ্লাইওভারের মূল অবকাঠামোর কাজ শেষের পথে হলেও সড়কজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ি ও শাটারিংয়ের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিলশিমলা-বহরমপুর ফ্লাইওভারের কাজ চলায়  সিটি বাইপাস দিয়ে সরাসরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে যানবাহনকে কয়েক কিলোমিটার ঘুরে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। রায়পাড়া ফ্লাইওভারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে পাশেই ওয়াসার পানির লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে।


নগরীর বন্ধগেট, হড়গ্রাম রেলক্রসিং ও গৌরহাঙ্গা রেলক্রসিংয়ের ওপর তিনটি ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডিয়েনকো লিমিটেডের পিডি সুবোধ চন্দ্র মিত্র বলেন, আমরা যত দ্রুত পারছি নির্মাণকাজ করছি। এ বিষয়ে আমি কোনো তথ্য দিতে পারব না। সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন।


বিলসিমলা এলাকার ফ্লাইওভারের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্সের নির্বাহী পরিচালক  জারগিছুর রহমান বলেন, আমাদের ৭৫ থেকে ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়েছি। আশা করছি, এর মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে।


নগরীর গৌরহাঙ্গা এলাকার একাংশের ফ্লাইওভার নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এসইএলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক রাসেল আলম বলেন, ‘গ্যাস ও ইলেকট্রিক লাইনের কারণে নগর ভবন এবং স্টেশন এলাকার নির্মাণকাজ বন্ধ আছে। এই লাইন না সরালে কাজ সম্ভব নয়। এটা সরানো আমাদের হাতেও নেই। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অংশের কাজ চলমান। আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে এই অংশের কাজ শেষ হবে।


রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন বলেন, তিনটি ফ্লাইওভারের কাজ চলতি বছরের শেষেই শেষ হবে। তবে নানা জটিলতার কারণে শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বরের ফ্লাইওভারের মেয়াদ ২০২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, আমাদের কাজের উদ্দেশ্য জনজীবনের উন্নয়ন। কাজ চলাকালে সাময়িক অসুবিধা হলেও প্রকল্প শেষ হলে নগরবাসী এর সুফল পাবেন।


রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিল জটিলতার কারণে ঠিকাদাররা কাজ এগিয়ে নিতে পারেননি। সেই জটিলতা দূর করা হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, চলতি বছরের শেষ নাগাদ দুই থেকে তিনটি ফ্লাইওভার যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।