পদ্মায় নৌভ্রমণে মৃত্যুঝুঁকি!
রাজশাহীতে বর্ষা এলেই পদ্মার চেহারা বদলে যায়। পানি বাড়ে, স্রোত তীব্র হয়, নদীর বুকজুড়ে তৈরি হয় নতুন সৌন্দর্য। সেই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই নদীর পাড়ে ভিড় করেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউবা দল বেঁধে নৌকায় ওঠেন। ঢেউয়ের সঙ্গে দুলছে ছোট নৌকা। চারদিকে পানি আর পানি। নৌকার এক পাশে বসে কেউ নদীর দৃশ্য দেখছেন, কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলছেন। কেউ আবার একটু ভালো ছবি পাওয়ার আশায় নৌকার কিনার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাদের অনেকের শরীরেই নেই লাইফ জ্যাকেট। কারও হাতে জ্যাকেট থাকলেও সেটি গায়ে পরার আগ্রহ নেই।
রাজশাহীতে বর্ষার পদ্মায় নৌভ্রমণের এমন দৃশ্য এখন বেশ পরিচিত। নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষের আগ্রহও। পদ্মার এই উত্তাল সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন টি-বাঁধ, আই-বাঁধ, নবগঙ্গা, পদ্মা গার্ডেন আর তালাইমারি ফুলতলা ঘাটগুলোতে হাজারো পর্যটকের ঢল নামছে। সূর্যাস্তের আলোয় নদীর বুকে ভেসে বেড়ানোর আনন্দ পেতে কাঠের ট্রলার আর ছোট ডিঙি নৌকাগুলোতে ঝুলছে মানুষের ভিড়। কিন্তু চোখ জুড়ানো এই আনন্দের আড়ালেই জমে উঠছে এক নীরব হাহাকার। উত্তাল নদীতে নৌকায় ওঠার সময় নিরাপত্তার ন্যুনতম নিয়মটুকুও মানছেন না দর্শনার্থীরা। কিন্তু আনন্দের এই আয়োজনের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ঝুঁকি। কারণ ভরা পদ্মা শুধু সুন্দর নয়, একই সঙ্গে অনিশ্চিত ও প্রবল স্রোতস্বিনী।
টিবাঁধের মাঝি রিয়াদ বলেন, আমরা নৌকায় ওঠার সময় যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরতে বলি। কেউ ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে যান, কেউ আবার নৌকার কিনারায় বসেন। আমরা নিষেধ করলেও অনেকে গুরুত্ব দেন না। আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং ছোট করে। কিন্তু আমার তো তাদের জন্যই বলি।
টিবাঁধের ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদীর মাঝখানে ঘুরে বেড়ানো ট্রলারগুলোর অধিকাংশ যাত্রীর গায়ে লাইফ জ্যাকেট নেই। আইন অনুযায়ী প্রতিটি নৌযানে যাত্রীদের সমপরিমাণ লাইফ জ্যাকেট থাকা এবং তা পরিধান করা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দৃশ্য দেখা যায় তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটু নজরকাড়া ছবি বা ভিডিও পোস্ট করার লোভে জীবনকে বাজি রাখছেন অনেকে। চলন্ত নৌকার একদম সামনে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসা, লাইফ জ্যাকেট খুলে পোজ দেওয়া কিংবা বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য হারানোর মতো কাজ করছেন তারা।
বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘুরতে আসা সাকিবুল ইসলাম জানান, আসলে ভুলটা আমাদেরই নৌকায় উঠলে আমরা সাধারণত আনন্দ করি, ছবি তুলি, ভিডিও করি। কিন্তু অনেক সময় নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় থাকে না। লাইফ জ্যাকেট হাতে নিয়েও অনেকে পরি না। নদীর মাঝখানে এসে বুঝতে পারি, আসলে ঝুঁকি কতটা। এখন মনে হয়, ছবি বা আনন্দের চেয়ে জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ পদ্মার এই উত্তাল রূপ যতটা মোহনীয়, ততটাই নিষ্ঠুর। গত কয়েক বছরের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ভরা মৌসুমে অসাবধানতা আর লাইফ জ্যাকেট না পরার খেসারত দিতে হয়েছে বহু প্রাণ দিয়ে। পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা রাজশাহীর নানা বিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে দূর-দূরান্ত থেকে ঘুরতে আসা মানুষ যে এই পদ্মার বুকে স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে, তার হিসেব কম নয়। একটি অসাবধান মুহূর্ত, একটুখানি পা পিছলে যাওয়া বা ছোট একটি ডিঙি উল্টে যাওয়ার পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা অতীতে বহুবার প্রমাণ হয়েছে। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া নিথর দেহ আর ঘাটে স্বজনদের হৃদয়বিদারক আহাজারি যেন বর্ষার পদ্মার নিয়মিত বিরতির করুণ চিত্র।
পদ্মায় ঘুরতে আসা যাত্রী তাহসিনা জানান, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে পদ্মায় ঘুরতে আসা খুবই আনন্দের। কিন্তু নদীর পানি বাড়লে ভয়ও লাগে। বিশেষ করে ছোট নৌকায় অনেকে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, নড়াচড়া করেন—এটা খুব বিপজ্জনক। ওদেরকে থামতে বললেও থামে না ।
মাঝি রহমত আলী বলেন, বর্ষার সময় নদীতে পানি বেশি থাকে, স্রোতও থাকে। বাইরে থেকে নদী শান্ত মনে হলেও অনেক জায়গায় স্রোত বেশি। তারা কোনো কথাই শুনে না। বন্ধুবান্ধবের দল উঠলে সব থেকে বেশি ঝামেলা হয়, অন্যরা খুব বিরক্ত হয়।
রাজশাহী অঞ্চলের নৌপুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, আমরা সবসময় যাত্রীদের সর্তক করছি। কিন্তু অনেক যাত্রী লাইফ জ্যাকেট নিচ্ছেন না। তবে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে। যাত্রীরা লাইফ জ্যাকেট না পরলে কোন নৌকা যেন না ছাড়া হয় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।