পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ব্রীজের কাজ বন্ধ, দূর্ভোগে লাখো মানুষ
দফায় দফায় শিবগঞ্জ পাগলা নদীর ওপর নির্মাণাধীন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মইন উদ্দিন আহমদ মন্টু ডাক্তার ব্রীজের কাজ বন্ধ হওয়ায় শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ছয়টি ইউনিয়ণৈল প্রায় তিন লাখ মানুষের আকাঙ্খা পূরণ হলো। নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে হযেছিল প্রায় তিন বছর আগে। চলতি বছরের নভেম্বরে কাজ হওয়ার কথা থাকলেও ব্রীজ সংলগ্ন রাস্তা ও ব্রীজের প্রায় ৪০% কাজ বাকি আছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য মতে, ব্রীজের দুই পাশে প্রায় ৩৫টি বাড়ির জমি অধিগ্রহন না হওয়া ও বর্ষার অজুহাতে প্রায় প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্রীজের কাজ থমকে গেছে। দুর্ভোগে পড়েছে ছয়টি ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষ।
জানা গেছে, জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার সর্ব উত্তর পশ্চিমের ছয়টি ইউনিয়ন মনাকষা, বিনোদপুর ও দুলর্ভপুর, উজিরপুর, পাঁকা ও শ্যামপুর লাখ লাখ মানুষের চলাচলের একমাত্র রাস্তা শিবগঞ্জ বাজার থেকে পাগলা নদীর ব্রীজ হয়। ২০২৩ সালের ১৪ অক্টোবর ব্রীজটির উদ্বোধন করেন সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর ব্রীজের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ১৪ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ২৯ কোটি ৯৮ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৫ টাকা ব্যয়ে ১৭২.৩০০ মিটার ব্রীজ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল।
এদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নির্মাণধীন সেতুর পাশের বেইলি ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ব্রিজের প্রবেশমুখে ইটের পিলার বানিয়ে তিন বছর ধরে ভারী যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। এতে করে দুর্লভপুর, মনাকষার ও বিনোদপুর সহ বিভিন্ন উনিয়নের শত শত বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ীদেরপণ্য আনার জন্য ২০/৩০ কিলোমিটার ঘুরে কানসাট ব্রীজ দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। যাতায়াতে ঝুঁকি ও খরচ বাড়ছে। প্রায় ৪০ বছর আগে নির্মিত বেইলি ব্রীজটি জরাজীর্ণ, সরু ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সারাদিন যেমন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট থাকছে, অন্যদিকে তেমনি অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট যানবাহনগুলোকে চলাচল করতে হচ্ছে। ব্রীজটির স্টিলের পাটাতন পাল্টাতে পাল্টাতে শতক ছেঁড়ার শত তালির মত অবস্থা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা সহ বিভিন্ন পেশার শত শত চাকরিজীবি ও ব্যবসায়ীর সময় মত অফিসে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও ব্যবসা কেন্দ্রে পৌছাতে না পেরে চরম হয়রানির কবলে পড়তে হচ্ছে।
সরজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে , শুরুর দিকেই নির্মাণে অনিয়ম হওয়ায় এলাকাবাসী বাধা দিয়েছিলেন। পরে তদন্ত করে অনিয়ম দূর করা হয়েছে। ৪৫ ভাগকাজ শেষের পর দ্বিতীয় দফায় নির্মাণ অতিবৃষ্টি এবং বন্যার কারণে বন্ধ ছিল। বন্যা পরবর্তী কাজ শুরুর পর ৬০ ভাগ কাজ শেষে বর্তমানে বন্ধ আছে জমি অধিগ্রহণ ও বন্যা জটিলতায়।
দুর্লভপুরের মুদি দোকান মালিক শাহিন আলী জানান, শিবগঞ্জ বাজার থেকে তার দোকানের দুরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার হলেও ট্রাকে করে পণ্য আনার জন্য ৩০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে তার পরিবহন খরচ বাড়ছে।
বিনোদপুর ইউনিয়নের বাকরুলী বিশ্বনাথপুর গ্রামের হারুন অর রশিদ জানান, তিনি জরুরি কাজে জেলা শহরের যাওয়ার জন্য পাগলা নদীর বেইলি ব্রীজে যানজটের কারণে দুই কিলোমিটার পায়ে হেঁটে আবার শিবগঞ্জ বাজার হতে চাঁপাইনবাবঞ্জ শহরে যেয়েও কাজ হয়নি দেরি হওয়ার কারণ।
অটো ও মাহন্দ্রে চালক জসিম ও আব্দুর রশিদ বলেন, আমরা পেটের দায়ে ছোট ছোট যানবাহন চালাই কিন্তু বেইলি ব্রীজটি অত্যন্ত শুরু ও ঝুঁকি পূর্ণ হওয়ায় অন্যদিকে নতুন ব্রীজের কাজ স্থগিত থাকায় নানা সমস্যার কারণে ঠিকমত যানবাহন চালাতে পারি না। এতে সংসার আটকে যাবার মত অবস্থা।
শিবগঞ্জ সরকারী মডেল হাই স্কুলের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিফাত জানান, সরু এবং এক লেনের জরাজীর্ণ ব্রীজ হওয়ায় দুইটি অটোরিক্সা ক্রস করতে যেয়ে দূর্ঘটনা ঘটে। ফলে দেরি হওয়ায় ঠিকমত বিদ্যালয়ে ক্লাশ ধরতে পারি না। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় দুর্লভপুর, মনাকষা ও বিনোদপুর সহ ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ ভোটারসহ সোয়া সাড়ে তিন লাখ মানুর ব্যস্ততম এ ব্রীজটির নির্মাণে বর্তমানে স্থগিত থাকায় জনগণের ভোগান্তি চরমে। দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা তার।
ভোক্তভোগী বাড়ির মালিক সুমাইয়া খাতুনের দাবি তাদের সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও প্রশাসন জমির মূল্য নিয়ে কথা বলছেনা। উল্টো তারা বছর খানেক আগে নোটিশ দিয়েই খালাস। তার দাবি একমাত্র মাথার গোঁজার ঠাঁই আমরা কিছুতেই হাতছাড়া করবোনা। অপর নোটিশ প্রাপ্ত বাড়ির মালিকের দাবি, অনেক কষ্টে তাদের বানানো বাড়ির নায্য ক্ষতিপূরণ না পেলে তারা একচুলও সরবেন না।
দুলর্ভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: গোলাম আজম জানান, প্রশাসন বলছে সঠিক কাগজপত্র না থাকায় ভোক্তভোগীরা কোন ক্ষতিপূরণ পাবেনা। আবার ভোক্তভোগীদের দাবি তাদের সঠিক কাগজপত্র আছে। ভূমি মালিক দাবিকারী ও প্রশাসনের দীর্ঘসুত্রতার জন্য এ জনদুর্ভোগ।
ব্রীজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো: সাহিন আলম বলেন, টিকটকার সাংবাদিকরা গুজব ছড়াচ্ছে যে ঠিকাদার পালিয়ে গেছে। কিন্তু বন্যা, বৃষ্টি এবং ভূমি অধিগ্রহনের জন্যই আটকে আছে তাদের নির্মাণের কাজ। ব্রীজের দুই দিকের জমি অধিগ্রহণ ও বাড়ি উচ্ছেদের ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন। শিগগিরই উচ্ছেদ সম্পূণ্ন হবে এবং যথাসময়ে ব্রীজের কাজ শেষ হবে। ব্রীজের নির্মাণের ঠিকাদার আব্দুল মান্নান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাদের কোন গাফলতি নাই। উচ্ছেদের বিষয়টি সমাধান ও বর্ষা পর হলেই যথা সময়ে ব্রীজের নির্মাণ কাজ শেষ করবো।
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো: সাহিনুল ইসলাম বলেন, বর্ষার কারণে ব্রীজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাঝের পিলারের কাজ বন্ধ আছে। তবে এসময়ে ব্রীজটির দু’পাশের এ্যাপ্রোজ সড়কের কাজটি হয়তো করা যেত। কিন্তু জমি অধিগ্রহনের কাজ এখনও শেষ না হওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছেনা। ব্রীজটির দুই দিকের জমি অধিগ্রহণ ও বাড়ি উচ্ছেদের ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন। আশা করি, শিগগিরই উচ্ছেদ হবে এবং যথাসময়ে ব্রীজের কাজ শেষ হবে।