বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬

ব্রহ্মাণ্ডের ৯৫ শতাংশই অদৃশ্য! ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির রহস্যসন্ধানে মহাকাশে টেলিস্কোপ

সোনার দেশ ডেস্ক ২৭ আগস্ট ২০২৬ ০২:৫৯ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ২৭ আগস্ট ২০২৬ ০২:৫৯ অপরাহ্ন
ব্রহ্মাণ্ডের ৯৫ শতাংশই অদৃশ্য! ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির রহস্যসন্ধানে মহাকাশে টেলিস্কোপ
মহাকাশে ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির খোঁজে টেলিস্কোপ পাঠাচ্ছে নাসা। ছবি: সংগৃহীত।

জেমস্‌ ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, হাব্‌ল টেলিস্কোপের পর এ বার মহাকাশে আরও এক শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ যন্ত্র পাঠাতে চলেছে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। তার নাম ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। এত দিন আমেরিকার বিজ্ঞানীরা কেবল মহাকাশের দৃশ্যমান বস্তুগুলির পর্যবেক্ষণেই জোর দিচ্ছিলেন। তবে এ বার তাঁদের লক্ষ্য ভিন্ন। এ বার ব্রহ্মাণ্ডের আপাত অদৃশ্য বস্তুগুলিকে ‘পর্যবেক্ষণ’ করতে চায় নাসা। সেটাই হবে নতুন টেলিস্কোপটির প্রধান কাজ।


মহাকাশের যা কিছু আমরা দেখতে পাই, অর্থাৎ গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, গ্রহাণু কিংবা অন্যান্য দৃশ্যমান পদার্থ সামগ্রিকের সাপেক্ষে অতি সামান্য। ব্রহ্মাণ্ডে দেখা যায় কেবল পাঁচ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশ জুড়েই রয়েছে ‘ডার্ক এনার্জি’ এবং ‘ডার্ক ম্যাটার’, যা মহাবিশ্বের বৃহত্তম রহস্য। এগুলি দেখার মতো কোনও যন্ত্র এখনও পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয়নি। তবে এর অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা টের পান। তাই তাদের নিয়ে কৌতূহলেরও শেষ নেই। সেই ‘অদেখা’ রহস্যেই নাসাকে পথ দেখাবে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ, আশা বিজ্ঞানীদের।


ডার্ক ম্যাটার কী?

নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটার এমন একধরনের অদৃশ্য পদার্থ যা কোনও ভাবে আলোকে শোষণ বা প্রতিফলন করে না। আলোর বিচ্ছুরণও ঘটায় না। এটি ছায়াপথগুলিকে একত্রে ধরে রাখার জন্য অতিরিক্ত মহাকর্ষীয় শক্তি জোগায়। বিজ্ঞানীরা বলেন, ডার্ক ম্যাটার না থাকলে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা নক্ষত্রগুলি দ্রুত ঘুরতে ঘুরতে একসময় ছিটকে বেরিয়ে যেত। মহাবিশ্বের ২৭ শতাংশ জুড়ে এই ডার্ক ম্যাটার রয়েছে। চোখে দেখা না গেলেও এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। দূরবর্তী ছায়াপথ থেকে আসা আলো ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় টানের প্রভাবেই বেঁকে যায়। একে বলে ‘গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং’। এর মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বুঝতে পারেন বিজ্ঞানীরা।


ডার্ক এনার্জি কী?

মহাবিশ্বের ৬৮ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ডার্ক এনার্জি। এটি একটি রহস্যময় শক্তি, যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণকে ত্বরাণ্বিত করে। ডার্ক এনার্জি মূলত একটি বিকর্ষণকারী শক্তি। মহাকর্ষ যেমন বস্তুকে আকর্ষণ করে, এটি তার বিপরীত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ডার্ক এনার্জি আসলে ব্রহ্মাণ্ডের শূন্যস্থানকেই বিকর্ষণ করে। ফলে মহাবিশ্ব আরও প্রসারিত হতে থাকে। ডার্ক ম্যাটার ছায়াপথের চারপাশে পুঞ্জীভূত। কিন্তু ডার্ক এনার্জি মহাশূন্যের সর্বত্র সমান ও সুষম ভাবে বিন্যস্ত রয়েছে।


নাসার নতুন টেলিস্কোপটির কাজ কেবল ডার্ক এনার্জি বা ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান নয়। বিশাল পরিসরে মাধ্যাকর্ষণ পরীক্ষা, সৌরজগতের বাইরে নতুন নতুন গ্রহ আবিষ্কারেও এই যন্ত্র কাজে লাগাতে চান বিজ্ঞানীরা। আগামী রবিবার ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে এই টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে নাসার। ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের মহাকাশযানে করে টেলিস্কোপটিকে মহাকাশে পাঠানো হবে। গোটা প্রকল্পের জন্য ৪০০ কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে। মার্কিন সংস্থার আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের ন’মাস আগেই ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে যাচ্ছে।


১৯৯০ সালে হাব্‌ল টেলিস্কোপ মহাকাশে পাঠিয়েছিল নাসা। তার উদ্দেশ্য পৃথিবীর নিকটবর্তী কক্ষপথ থেকে ব্রহ্মাণ্ডকে পর্যবেক্ষণ করা এবং উচ্চমানের ছবি ও বর্ণালী সংক্রান্ত তথ্য বিজ্ঞানীদের পাঠানো। এর মাধ্যমে মহাজাগতিক বিবর্তন, নক্ষত্রের জন্ম বা মৃত্যু এবং দূরের ছায়াপথগুলির অজানা কথা জানতে পারেন বিজ্ঞানীরা। এই সংক্রান্ত গবেষণাতেও তা কাজে লাগে। এর পর ২০২১ সালে নাসা মহাকাশে পাঠায় আরও শক্তিশালী জেম্‌স ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে প্রাচীন, দূরবর্তী ছায়াপথগুলি অনুসন্ধান, গ্রহ ও নক্ষত্রের জন্মরহস্য উদ্‌ঘাটন তার মূল লক্ষ্য। হাব্‌ল এবং জেম্‌স ওয়েবের অনুসারী হিসাবেই মহাকাশে পাড়ি দিতে চলেছে রোমান। এতে আরও শক্তিশালী ক্যামেরা এবং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশা, এর মাধ্যমে ব্রহ্মাণ্ডকে এমন ভাবে দেখা যাবে, যা আগে কখনও যায়নি। রোমানের সিনিয়র প্রজেক্ট বিজ্ঞানী জুলি ম্যাকএনরির কথায়, ‘‘রোমানের পরিসর অনেক বড়। এর মাধ্যমে আমরা অদ্ভুত, বিরল এবং অস্বাভাবিক বিষয়গুলি খুঁজে পাব। এটি সেই সুযোগ আমাদের করে দেবে।’’


টেলিস্কোপটির মূল সার্ভে সম্পন্ন হতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০০ কোটিরও বেশি ছায়াপথ নিয়ে সার্ভে চালাবে রোমান টেলিস্কোপ। এর মাধ্যমে নক্ষত্র বা ছায়াপথ কী ভাবে গড়ে উঠেছে, কী ভাবে বিবর্তিত হয়েছে, জানা যাবে। ব্রহ্মাণ্ড কী ভাবে প্রসারিত হয়েছে, তা পরিমাপও করা যাবে। সেই বিষয়গুলিই ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জির মৌলিক প্রকৃতি উন্মোচনের চাবিকাঠি হয়ে উঠবে, আশা বিজ্ঞানীদের।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন