ফার্মেসি থেকে কেনা ভুল ওষুধ খেয়ে মৃত্যু পথযাত্রী নওগাঁর আখের আলী
নওগাঁর রাণীনগরের ত্রিমোহনী বাজারের ইসলামিয়া মেডিকেল হল নামক ফার্মেসী থেকে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে ওষুধ না দিয়ে ক্যান্সার প্রতিরোধের ওষুধ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রোগী সেই ওষুধ খেয়ে বর্তমানে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। এমন জঘন্যতম কাজের জন্য ওই ফার্মেসীর মালিকের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানিয়েছে ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয়রা।
সূত্রে জানা গেছে যে, নওগাঁ সদর উপজেলার গাংজোয়ার গ্রামের মৃত-বাস্তুল আলী মন্ডলের ছেলে আখের আলী মন্ডল গত ৩১জুলাই রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হসপিটালের চিকিৎসক ডা: মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাজুর কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। পরে বাড়ি যাওয়ার পথে রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহনী বাজারের আবু রায়হানের ইসলামিয়া মেডিকেল হল নামের ফার্মেসী থেকে ওষুধ ক্রয় করেন। এসময় ওই দোকানের কর্মচারী ব্যবস্থাপত্রে থাকা ব্যথানাশক ওষুধ না দিয়ে ১০দিনের জন্য ভুল করে ক্যান্সার প্রতিরোধের ওষুধ প্রদান করে। এরপরও তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে দিনে ৩বার করে ওই ওষুধ খান।
ওষুধ খাওয়ার পর আখের আলী অসুস্থ্য হতে থাকেন। ১০দিনের ওষুধ শেষে তিনি ওই ফার্মেসীতে পুনরায় গিয়ে ওষুধ খাওয়ার পর অসুস্থ্যতার কথা বললে আবার ওই দোকানের কর্মচারীরা অবশিষ্ট ৭দিনের জন্য ক্যান্সার প্রতিরোধক ওই ওষুধটি দেয়। পরবর্তিতে আখের আলী ৭দিরে ওই ওষুধ খাওয়ার পর আরো গুরুত্বর অসুস্থ্য হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী হয়ে পড়লে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া ওই চিকিৎসককে বিষয়টি অবগত করলে চিকিৎসক সরেজমিনে আখের আলীর বাড়িতে এসে দেখেন ফার্মেসীর লোকেরা আখের আলীকে ব্যবস্থাপত্রে থাকা ওষুধ না দিয়ে ক্যান্সার প্রতিরোধক ওষুধ দিয়েছে। এতে করে আখের আলীর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হলে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে নিয়ে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা হয়। এই চিকিৎসা গ্রহণ করার পর আখের আলী বর্তমানে কিছুটা সুস্থ্য হতে শুরু করেছেন।
আখের আলীর বড় ছেলে রাসেল হোসেন জানান চিকিৎসক তার বাবাকে গবঃযড়ভষবী নামের একটি ওষুধ প্রেসক্রাইব করেছিলেন। কিন্তু ফার্মেসি থেকে ওই ওষুধের পরিবর্তে গবঃযড়ঃৎবী ১০ সম (গবঃযড়ঃৎবীধঃব ইচ ১০ সম) দেওয়া হয়। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে তিনি ওষুধটি দিনে তিনবার করে সেবন করেন। এরপর রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। তার শরীরে সংক্রমণ দেখা দেয় এবং মুখ ও গলায় গুরুতর ঘা/মিউকোসাইটিস তৈরি হয়। একপর্যায়ে তিনি পানি পর্যন্ত গিলতে পারছিলেন না এবং হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। রক্তের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কোষ কমে যায়। হাসপাতালে করা ঈইঈ পরীক্ষায় রোগীর রক্তের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি উপাদানই অত্যন্ত কম পাওয়া যায়। একটি ঈইঈ রিপোর্টে দেখা যায়- ঐবসড়মষড়নরহ: ৮.৬ ম/ফখ. ডইঈ: ৬৪০/পঁসস. চষধঃবষবঃ: ৪৬,০০০/পঁসস অর্থাৎ রোগীর ঢ়ধহপুঃড়ঢ়বহরধ দেখা দেয়। বিশেষ করে ডইঈ অত্যন্ত কমে যাওয়ায় গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। পরবর্তীতে করা ইড়হব গধৎৎড়ি ঊীধসরহধঃরড়হ-এ দেখা যায়, রোগীর নড়হব সধৎৎড়ি যুঢ়ড়ধপঃরাব, অর্থাৎ অস্থিমজ্জার কার্যক্রম অত্যন্ত কমে গেছে। রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়: (ঐুঢ়ড়ধপঃরাব সধৎৎড়ি (গড়ংঃ ঢ়ড়ংংরনরষরঃু ড়ভ ধঢ়ষধংঃরপ ধহধবসরধ) ।
রাসেল আরো জানান ওষুধ একজন মানুষের জন্য যেমন বাঁচার উপায় ভুল হলে তেমনি ভাবে সেটি মরণেরও কারণ। সেটি বুঝতে পারলাম বাবার মাধ্যমে। একটি ফার্মেসীতে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বোঝে না এমন হাতুড়ে মার্কা কর্মচারী দিয়ে ওষুধ বিক্রি একটি জঘন্য অপরাধ। আজ তার অর্থ আছে বলেই তিনি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে পুনরায় সঠিক চিকিৎসা প্রদান করতে পেরেছেন বলেই আজ তার বাবা মৃত্যুর দুয়ার থেকে বেঁচে ফিরতে পারছেন। বাবা মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফেরত আসলেও তিনি আর আগের মতো একজন স্বাভাবিক মানুষ হয়ে বাঁচতে পারবেন না। বর্তমানে তার বাবার মাথার চুল ও দাঁড়ি উঠে গেছে, শরীরে বড় বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এমন অবস্থা যদি কোন গরীব, অসহায় মানুষের ক্ষেত্রে হতো তাহলে অর্থের অভাবের কারণে সেই ব্যক্তিটি সঠিক চিকিৎসার অভাবে মারা যেতেন। তিনি সরকারের কাছে এই ফার্মেসীর মালিকের দৃষ্টান্তর মূলক শাস্তি কামনা করেছেন।
রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ হসপিটালের চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাজু জানান যদি তিনি খবর পেয়ে ওই রোগীর বাড়িতে না যেতেন নিঃসন্দেহে আজ রোগী মারা যেতেন। পরবর্তিতে তিনি ওই ফার্মেসীতে গিয়ে এই বিষয়টি জানালে ফার্মেসীর মালিক আবু রায়হান কর্মচারীদের ভুলের উপর দায়ভার চাপিয়ে দেন। সরকারের উচিত প্রতিটি ওষুধের ফার্মেসীতে ফার্মাসিস্টদের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি করার বিষয়টি নিশ্চিত করা। দেশের অধিকাংশ ফার্মেসীর মালিকরা কম বেতনের মাধ্যমে রাস্তা থেকে কর্মচারী এনে ওষুধ বিক্রি করছেন যারা চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্র সম্পর্কে কোন জ্ঞানই রাখে না। ব্যবস্থাপত্র বুঝতে না পারলে ওই কর্মচারীরা চিকিৎসকের কাছে না জেনে নিজেদের ইচ্ছে মাফিক ওষুধ দিয়ে থাকে যার কারণে আজ আখের আলীর মতো ভুল ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন দেশের অসংখ্য মানুষ। এই সব ফার্মেসীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।
ফার্মেসীর মালিক আবু রায়হানের কাছে ভুল করে ওষুধ দেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান তিনি ওই রোগীর বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে এসেছেন। তার দোকানের কর্মচারী ভুল করে এক ওষুধের জায়গায় অন্য ওষুধ দিয়েছে বলে তিনি জানান। কেন তিনি তদারকি না করে গ্রাহকদের কাছে কর্মচারীদের মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি করছেন এমন বিষয় জানতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আর কোন কথা বলেননি।
বাংলাদেশ কেমিস্টস্ এন্ড ড্রাগিস্টস্ সমিতির রাণীনগর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের পিন্টু জানান দেশের ওষুধ বিক্রির আইন অনুসারে ফার্মেসীর মালিক কিংবা ওই দোকানের কর্মচারীদের অবশ্যই ফার্মাসিস্ট সনদ থাকতে হবে। ফার্মাসিস্টি ছাড়া ওষুধ বিক্রি দন্ডনীয় অপরাধ। যদি কোন ফার্মেসীর মালিক ফার্মাসিস্ট হন তাহলে তিনি নিজে তদারকির মাধ্যমে ফার্মাসিস্ট নয় এমন কর্মচারীর মাধ্যমে ওষুধ বিক্রি করতে পারবেন। ত্রিমোহনী বাজারের আবু ফার্মেসীর কর্মচারীর ভুল করে ওষুধ বিক্রির বিষয়ে যদি ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে সমিতির পক্ষ থেকে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান আহ্বায়ক।
রাণীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কেএইচএম ইফতেখারুল আলম খাঁন অংকুর জানান ফার্মেসী থেকে ভুল করে গ্রাহকের কাছে ওষুধ বিক্রির কোন সুযোগ নেই। অবশ্যই ফার্মাসিস্টের তদারকির মাধ্যমে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে মিল রেখে প্রতিটি ওষুধ বিক্রি করতে হবে। ভুক্তভোগী ব্যক্তি যদি লিখিত ভাবে অভিযোগ প্রদান করেন তাহলে দ্রুতই তদন্ত সাপেক্ষে ওই ফার্মেসীর মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান এই কর্মকর্তা।