মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬

কলেরার প্রাদুর্ভাব নেই, তবু কেন টিকার উদ্যোগ

সোনার দেশ ডেস্ক ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৫ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০৫ অপরাহ্ন
কলেরার প্রাদুর্ভাব নেই, তবু কেন টিকার উদ্যোগ
ছবি: প্রতীকী

দেশে কলেরা প্রতিরোধে বড় পরিসরে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রাদুর্ভাবের পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে এবার সংক্রমণ ঠেকাতে আগাম টিকা দেওয়া হচ্ছে। দেশের ১৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে দুই ডোজ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন (ওসিভি) দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।


‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’ নামের এই কর্মসূচির প্রথম ধাপ শুরু হয়েছে ২২ আগস্ট। চলবে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর। দুই ডোজের মধ্যে অন্তত ১৪ দিনের ব্যবধান রাখতে হবে। এক বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষ বিনামূল্যে এই টিকা পাচ্ছেন। তবে গর্ভবতী নারীরা কর্মসূচির আওতায় নেই।


বড় পরিসরে কলেরার টিকা দেওয়ার এই উদ্যোগে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, কেন এখন টিকা দেওয়া হচ্ছে। দেশে কি সংক্রমণ বেড়েছে, নাকি বড় কোনো প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা রয়েছে।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু দেশে কলেরার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়াই এবারের কর্মসূচির কারণ নয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই কলেরাপ্রবণ দেশ। দূষিত পানি ও খাবার, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, ঘনবসতি এবং পরিবেশগত নানা কারণে দেশে কলেরার ঝুঁকি রয়েছে। তাই রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে এবার ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আগেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


কলেরার ঝুঁকি কতটা আর কেন আগাম টিকা:

দেশে কলেরার ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। আইসিডিডিআর,বির হাসপাতালভিত্তিক নজরদারির তথ্যেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৪৩ হাজার ৪৮৩ জন ডায়রিয়া রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪ হাজার ৫৪০ জনের মধ্যে কলেরার জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষিত রোগীদের প্রায় ১১ শতাংশের মধ্যে কলেরার জীবাণু পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র ২০২৩ সালে পরীক্ষিত রোগীদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশের নমুনায় কলেরার জীবাণু শনাক্ত হয়। এছাড়া ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মোট ৫৭২জন কলেরা রোগী শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৫৩৬ জন কক্সবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, রোগের বোঝা, ঝুঁকিপ্রবণতা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, আগের টিকাদানের ইতিহাস এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মতো বিষয় বিবেচনা করে ১৪টি অগ্রাধিকার এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে দুই ডোজ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।


আইসিডিডিআর,বি বলছে, এটি বাংলাদেশে প্রথম বড় পরিসরের প্রতিরোধমূলক ওরাল কলেরা টিকাদান কর্মসূচি। উদ্যোগটি জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার অংশ।


স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চঝুঁকির এলাকায় আগাম প্রতিরোধ জোরদার করাই এবারের কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। প্রাদুর্ভাবের পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ঝুঁকি কমাতে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


টিকা দেওয়া হচ্ছে যেসব এলাকায়

এবার দেশের সব এলাকায় টিকা দেওয়া হচ্ছে না। কলেরার ঝুঁকি বিবেচনায় ১৪টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানা নির্বাচন করা হয়েছে।


কর্মসূচির আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচরের ১৭টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। টিকা দেওয়ার জন্য ১৯২টি কেন্দ্র করা হয়েছে।


এ ছাড়া, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও এবং ঢাকার বাইরে মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্দিষ্ট এলাকাও কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং যেসব এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ওপর চাপ বেশি, সেখানে কলেরার জীবাণু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সম্ভাব্য সংক্রমণের আগেই এসব এলাকার মানুষের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করাই এবারের কর্মসূচির লক্ষ্য।


আগেও হয়েছে কলেরার টিকাদান

বাংলাদেশে কলেরার টিকাদান নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই টিকা দেওয়া হয়েছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কলেরার ঝুঁকি তৈরি হলে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বড় আকারে ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়েও রোহিঙ্গা শিবিরে একাধিক দফায় টিকাদান হয়েছে।


২০২০ সালে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় প্রায় ১২ লাখ মানুষকে কলেরার টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে, করোনা মহামারির কারণে ওই কর্মসূচির দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া সম্ভব হয়নি।


এরপর ২০২২ সালে ঢাকার পাঁচটি এলাকায় বড় আকারে কলেরার টিকা দেওয়া হয়। ওই সময় রাজধানীতে তীব্র ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল এবং আক্রান্তদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে কলেরার জীবাণু শনাক্ত হয়েছিল। ২০২৫ সালেও কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বড় পরিসরে কলেরার টিকাদান করা হয়।


শুধু টিকায় নিয়ন্ত্রণ নয়

কলেরা প্রতিরোধে টিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. মোজাম্মেল হক।


তিনি বলেন, “কলেরার জীবাণু প্রধানত দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই টিকাদানের পাশাপাশি নিরাপদ পানি সরবরাহ, উন্নত স্যানিটেশন, খাবারের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। এসব মৌলিক বিষয় নিশ্চিত করা না গেলে শুধু টিকা দিয়ে কলেরার সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।”


তিনি আরো বলেন, “যেসব এলাকায় কলেরার ঝুঁকি বেশি, সেসব এলাকার মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদানের পরিধি বাড়ানো প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে টিকার আওতায় আনা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।”


স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “কলেরা প্রতিরোধে নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন ও কার্যকর রোগ নজরদারির পাশাপাশি ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য উপকরণ। সময়মতো চিকিৎসা না হলে তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতার কারণে কলেরা দ্রুত জীবনহানির কারণ হতে পারে।”


ফলে এবারের কর্মসূচিকে দেশে হঠাৎ করে বড় ধরনের কলেরা প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘদিনের ঝুঁকি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সংক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে প্রাদুর্ভাবের পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আগেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই বড় পরিসরে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 


তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি