সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন শি, দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কে নতুন গতির আশা
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
এনডিটিভি লিখেছে, নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শির সম্ভাব্য বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা, বাণিজ্য ঘাটতি এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনাদের সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধীরে ধীরে সেই বরফ গলছে।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আসন্ন ভারত সফর সেই প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আনতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
শনি ও রোববার দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শির বৈঠক হতে পারে।
গত বছর মোদীর চিন সফরের মাধ্যমে যে গতি তৈরি হয়েছিল, শির সফর তা আরও এগিয়ে নেবে বলে দুই দেশের কর্মকর্তাদের আশা।
প্রত্যাশার পারদ
চিনে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামী এক নিবন্ধে লিখেছেন, বিশ্বের দুই বৃহৎ উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও চিনের মধ্যে স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু দুই দেশের ২৮০ কোটি মানুষের স্বার্থেই নয়, এশিয়া ও বৃহত্তর বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এ মাসেই কিরগিজস্তানে একটি আঞ্চলিক ফোরামের ফাঁকে শি ও মোদীর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল।
চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে বলেছে, দুই নেতা দুই দেশকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার’ এবং পরস্পরের উন্নয়নের জন্য ‘হুমকি নয়, সুযোগ’ হিসেবে দেখেন।
এর আগে গত মাসে বেইজিংয়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং চিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র মধ্যে বৈঠক হয়। সেখানে উভয় পক্ষই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথে শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক বৈঠকের ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরেন।
সীমান্ত সমস্যা
এনডিটিভি লিখেছে, নয়া দিল্লির দীর্ঘদিনের অবস্থান হল, ভারত-চিন সম্পর্কের বৃহত্তর উন্নয়নের জন্য সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী মোদী এবারের বৈঠকেও বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পূর্ব লাদাখে সামরিক অচলাবস্থা নিরসন এবং সেনা প্রত্যাহারের পর উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা পুনরায় শুরু করতে কাজানে একমত হয়েছিল ভারত ও চিন।
সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি তদারকি করতে এবং সীমান্ত বিরোধের একটি ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে দুই নেতাই নিজ নিজ প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বাণিজ্য ঘাটতি
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ন্যায্য বাজার সুবিধা, সাপ্লাই চেইনের নির্ভরযোগ্যতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দূর করার বিষয়গুলো ভারতের এজেন্ডার কেন্দ্রে থাকবে।
আমদানির ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চিনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে চীনের সঙ্গে ভারতের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে।
চিন বর্তমানে ভারতের বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার। ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ১৫ হাজার ১১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
তবে এক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সাথে নয়া দিল্লির বাণিজ্য ঘাটতিও রেকর্ড ছুঁয়েছে। আগের ৯ হাজার ৯২১ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ঘাটতি এখন ১১ হাজার ২১৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
ভারত গত বছর ব্রিকস সদস্য দেশগুলোকে ‘বাণিজ্য বৈষম্য’ দূর করার আহ্বান জানিয়েছিল। এই বৈষম্য দূর করতে ভারতের জন্য বৃহত্তর বাজার সুবিধার বিষয়টি এবারও আলোচনায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চিনা সংবাদমাধ্যম সিজিটিএন-এর সাংবাদিক হুয়াং ইউ এনডিটিভিকে বলেন, “শি জিনপিংয়ের সাথে একটি বড় চিনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও নয়া দিল্লি যাচ্ছে। চিনা কোম্পানিগুলো ব্রিকস দেশগুলোতে বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজতে আগ্রহী।”
‘ইতিবাচক’ অগ্রগতি
সম্পর্কের বরফ গলার কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা গেছে। গত বছর ভারত ও চিন সরাসরি বিমান চলাচল ফের শুরু করেছে। পাশাপাশি চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াও সহজ করেছে নয়া দিল্লি।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ৬ বছর পর চলতি বছর ভারত-চিন সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় শুরু হয়েছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
১৯৯২ সালে লিপুলেখ পাস দিয়ে ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়েছিল, যা ২০১৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
গত ১ অগাস্ট চীনা কর্মকর্তারা ১৬ জন ব্যবসায়ী এবং ৪ জন সহায়তাকারীকে পণ্য ছাড়াই তিব্বতে প্রবেশের অনুমতি দেন, যার মধ্য দিয়ে দুই পক্ষ বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের সূচনা করে।
এছাড়া ঐতিহাসিক সিল্ক রুটের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য করিডোর সিকিমের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাথুলা পাস দিয়েও ছয় বছর পর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়েছে।
এনডিটিভি লিখেছে, সম্পর্ক উন্নয়নের এই গতিশীলতায় এখনও এক ধরনের বাধা রয়েছে।
উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে আগ্রহী। তবে এই সম্পর্ক কৌশলগত পর্যায় থেকে দীর্ঘস্থায়ী স্বাভাবিকীকরণের দিকে যাবে কি না, তার প্রধান পরীক্ষাটি হবে সীমান্তের উত্তেজনা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ