হুথিদের সাথে সংঘাতে সৌদি আরবের হাতে কেন খুব কম বিকল্প রয়েছে?
ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা এবং সৌদি আরবের ওপর তাদের হামলার মুখে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার খুব কম বিকল্পই খোলা রয়েছে রিয়াদের সামনে। আর সেই প্রতিটি বিকল্পেরই চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে মূল বার্তাটি হলো—রিয়াদ কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না। তবে হুথিদের বেপরোয়া আচরণ সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশটি শেষ পর্যন্ত হয়তো আরো বড় কোনো সংঘাতের দিকে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ঝুঁকি বিষয়ক পরামর্শক এবং ইয়েমেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-বাশা সিএনএনকে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে বড় ধরনের পাল্টা হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং সেই সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে।
তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে তাদের আর কোনো বিকল্প নেই।”
চলতি সপ্তাহে, জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ—বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন পেরিম দ্বীপ এবং মোচা বন্দর শহরটি দখল করে নিয়েছে। এর পরপরই ইরাক থেকে আসা ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের একটি প্রধান তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোনো পক্ষই এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
ইরান সংক্রান্ত উত্তেজনার জেরে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ -এর ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ভিন্ন পথে নেওয়া হচ্ছে, যা পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ ট্যাঙ্কারগুলোতে লোড করার কথা ছিল।
এই পরিস্থিতি গত মাসের শুরুর দিকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা উদ্বেগকে আরো জোরালো করে তুলেছে। দেশটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন , ইরান সমর্থিত হুথিদের সাথে যৌথভাবে কাজ করা ইরাকি মিলিশিয়াদের পক্ষ থেকে ‘একাধিক সমন্বিত হামলার’ আশঙ্কায় সৌদি আরব প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি অসম লড়াই বলে মনে হতে পারে—একদিকে বিপুল সম্পদশালী সৌদি আরব ও তাদের সুসজ্জিত আধুনিক সামরিক বাহিনী; অন্যদিকে বিপর্যস্ত ইয়েমেনের এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কিন্তু হুথিদের কোণঠাসা করা বা তাদের অবস্থান থেকে হটানো যে অত্যন্ত কঠিন কাজ, তা তারা বারবার প্রমাণ করেছে।
পশ্চিমা বিশ্ব এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু দেশ প্রায়শই হুথিদের একটি ‘অগোছালো’ বা ‘বিশৃঙ্খলাপূর্ণ’ মিলিশিয়া বাহিনী হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তারা তাদের সামরিক ও যুদ্ধকৌশল উন্নত করে চলেছে। গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলে আঘাত হেনে হুথিরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
হুথিদের দাবিগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে: তারা চায় সৌদি আরব যেন ভ্রমণ ও অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে উত্তর ইয়েমেনের বিশাল যে অংশটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেটিকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা বন্ধ করে। ইরানের সাথে মিত্রতা থাকলেও, হুথিদের নিজস্ব লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনাও রয়েছে।
হুথি পরিচালিত রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘সাবা’-র প্রধান নাসর আল-দিন আমের শুক্রবার সিএনএনকে বলেছেন, সৌদি আরবের ‘অন্যায়ভাবে ১২ বছর ধরে চাপিয়ে রাখা অবরোধ’ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত হুথিরা তাদের ওপর ‘চাপ প্রয়োগ’ অব্যাহত রাখবে—যা সংঘাত আরো তীব্র করার স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
এই মুহূর্তে সৌদি আরব এমন একটি ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীর মোকাবিলা করছে, যারা ইয়েমেনে নিজেদের ভূখণ্ডগত নিয়ন্ত্রণ বিস্তারে বদ্ধপরিকর। এক্ষেত্রে সৌদি আরবের সামনে খুব একটা বিকল্প খোলা নেই।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর ভিজিটিং ফেলো সিনজিয়া বিয়াঙ্কো সিএনএনকে বলেছেন, “হুথিদের সাথে এই সংঘাতে সৌদি আরবের হাতে সত্যিই খুব সীমিত বিকল্প রয়েছে।”
তিনি বলেন, “একটি পথ হলো সংঘাতের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া, তবে এর জন্য সৌদি আরবকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে।”
বিয়াঙ্কোর মতে, রিয়াদ যদি সত্যিই ‘সর্বাত্মক পদক্ষেপ’ নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তা ইয়েমেনের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মতো একটি দীর্ঘস্থায়ী ও অনির্দিষ্টকালের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে তাতে ইরানেরও জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যারা ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।
বিয়াঙ্কো বলেন, “তখন এই সংঘাতকে কেবল ইয়েমেনকেন্দ্রিক পরিস্থিতি হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন হয়ে পড়বে; বরং এটিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর যুদ্ধেরই একটি অংশ হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে সৌদি আরব এখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।”
এদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করার সম্ভাবনা কম—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির চলমান সংকট, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্কের প্রেক্ষাপটে।
বিয়াঙ্কো বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বা সম্পৃক্ততা আরো জোরদার করার মতো অবস্থানে ট্রাম্প নেই।”
পর্দার আড়ালে, নতুন করে শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সৌদি আরবের চাপকে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই প্রতিহত করে আসছে।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরোণের আরেকটি উপায় হলো সংঘাত থেকে রাজনৈতিকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজা, তবে সেই বিকল্পটির জন্য হয়তো এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বিয়াঙ্কো বলেন, গত কয়েক মাস ধরে সৌদি আরব ‘কৌশলগত সংযম’ বা ধৈর্য প্রদর্শন করে আসছে; রিয়াদ হুথি ও ইরান—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই বারবার সতর্কবার্তা ও নিন্দা জ্ঞাপন করা সত্ত্বেও তাতে কোনো ফল মেলেনি।
পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার জবাবে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘সৌদি আরব এই মুহূর্তে কোনো পাল্টা পদক্ষেপ না নিয়ে ইরাকি সরকারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে’। কারণ ইরাকের ভূখণ্ড থেকেই এই হামলাটি চালানো হয়েছিল।
বিয়াঙ্কো জানান, সৌদি আরবের হাতে থাকা ‘রাজনৈতিক সমাধানের সব পথই এখন নিঃশেষিত।’
এমনকি রিয়াদ যদি হুথিদের সাথে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতেও চায়, তবে তার জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।
তথ্যসূত্র: রাইজিংবিডি