সুদানে নিহত সেনাসদস্য মাসুদের বাড়িতে শোকের মাতম

নাটোর প্রতিনিধি:
সুদানের আবেই এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী মারা গেছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন নিহতদের মধ্যে একজন নাটোরের লালপুর উপজেলার আরবাব ইউনিয়নের বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কর্পোরাল মাসুদ রানা (৩০)। তার মৃত্যুতে পুরো এলাকাজুড়ে নেমেছে শোকের ছায়। নিহত মাসুদ রানা বোয়ালিয়াপাড়া গ্রামের সাহার উদ্দিনের ছেলে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মাসুদ রানা ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তার মেজো ভাই মনিরুল ইসলাম ২০১২ সালে এবং ছোট ভাই রনি আলম ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সর্বশেষ শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ার আগে মাসুদ রানা যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন।
চলতি বছরের গেল ৭ নভেম্বর স্ত্রী ও আট বছরের কন্যা সন্তান মাগফিরাতুল মাওয়া আমিনাকে রেখে শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে সুদানে যান মাসুদ রানা। তিনি ২০০৬ সাল থেকে প্রায় ১৯ বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। শান্তিরক্ষী হিসেবে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার স্বপ্নে ৩৬ দিন আগে বিদেশের মাটিতে পা-রাখেন। কিন্তু সেখানে তিনি সন্ত্রাসীদের হামলায় মারা যান।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) তার মৃত্যুর খবর প্রথম জানতে পারেন তার ছোট ভাই সেনাসদস্য রনি আলম। পরে তিনি বিষয়টি পরিবারের অন্য সদস্যদের জানান। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। বাড়িতে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে চারপাশ।
শহীদ মাসুদ রানার মা মর্জিনা খাতুন ছেলের মৃত্যুর খবরে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ডিউটির কষ্টের কথা জানতে চাইলে সে বলল, মা এখন আর কষ্ট নাই, ডিউটি কম। আমাকে ভালো থাকতে বলে ছেলে নিজেই চলে গেল। স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী আসমাউল হুসনা আঁখিও শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন।
প্রতিবেশীরা জানান, শান্ত ও মিশুক স্বভাবের মানুষ ছিলেন মাসুদ রানা। চাকরি পাওয়ার আগে পরিবারের আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিল। তবে তিন ভাই চাকরি পাওয়ার পর পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফেরে।
মাসুদ রানার ছোট ভাই রনি আলম বলেন, দেশের জন্য আমার ভাই শহীদ হয়েছেন। এই আত্মত্যাগে আমরা গর্বিত। যদিও শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।
এ বিষয়ে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারের পাশে থাকার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সুদানে হতাহত ১৪ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর পরিচয় মিলেছে
সুদানের আবেইতে ইউএন ঘাঁটিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ শান্তিরক্ষী নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর এবং তার সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। তাদের সবার পরিচয় জানিয়েছে আইএসপিআর।
রোববার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
আইএসপিআর জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে শনিবার স্থানীয় সময় আনুমানিক বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। হামলায় দায়িত্বরত ৬ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শহীদ হন এবং ৮ জন আহত হন।
শহীদ শান্তিরক্ষীরা হলেন, কর্পোরাল মো. মাসুদ রানা, (নাটোর), সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম, (কুড়িগ্রাম), সৈনিক শামীম রেজা, (রাজবাড়ি), সৈনিক শান্ত মন্ডল, (কুড়িগ্রাম), মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম
(কিশোরগঞ্জ) ও লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া (গাইবান্ধা)
আহত শান্তিরক্ষীদের নাম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান, সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন, কর্পোরাল আফরোজা পারভিন ইতি, ল্যান্স কর্পোরাল মহিবুল ইসলাম, সৈনিক মো. মেজবাউল কবির, সৈনিক মোসা. উম্মে হানি আক্তার, সৈনিক চুমকি আক্তার, অর্ডন্যান্স ও সৈনিক মো. মানাজির আহসান, বীর (নোয়াখালী)।
আইএসপিআর আরও জানায়, আহত ৮ জন শান্তিরক্ষীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে সৈনিক মো. মেজবাউল কবিরের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় এরইমধ্যে তার সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। অপর আহত ৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তারা সবাই শঙ্কামুক্ত।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। শহীদ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় নিদর্শন হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয় এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয় বলেও জানিয়েছে আইএসপিআর।