শুক্রবার, অক্টোবর ১৬, ২০২৬
আজ বিশ্ব খাদ্য দিবস

দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও আমদানি-নির্ভরতা কাটছে না

সোনার দেশ ডেস্ক ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩৯ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৩৯ অপরাহ্ন
দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও আমদানি-নির্ভরতা কাটছে না

দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়লেও ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে। সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত থাকলেও উৎপাদন, সরবরাহ, বাজারমূল্য ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 


খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫১০ টন চাল ও গম আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে চাল ৩০ হাজার ৭৩০ টন এবং গম ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৭৮০ টন। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই এসব খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। 


গত অর্থবছরে দেশে মোট ৮৬ লাখ দুই হাজার ৮০ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছিল। এর মধ্যে চাল ছিল ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টন এবং গম ৭৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯০ টন। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিতে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। সরকারি খাদ্য মজুত ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে একদিকে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানির কারণে দেশীয় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত না হন।


এমন বাস্তবতায় আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। এই দিবসে এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন আগামীর সমৃদ্ধি’। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, আবাদি জমির সংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় উদ্বেগের বিষয়। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা এক হাজার কোটিতে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। এ অবস্থায় সীমিত জমি ও সম্পদ ব্যবহার করে কীভাবে সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা যাবে– সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার নাগালে খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।


কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, আমদানি কমাতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। এ জন্য কৃষিতে নতুন উদ্ভাবন প্রয়োজন। সরকার বলছে, উৎপাদন বাড়ছে। তবে আমদানিরও তথ্য দিচ্ছে।       

          

বিশ্ব খাদ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পুষ্টি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষক যাতে উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যায্যমূল্য পান, আবার ভোক্তারাও যাতে সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারেন, সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি।


খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্যের মোট মজুত ছিল ২২ লাখ ৭১ হাজার ২২৬ টন। এর মধ্যে চাল ১৯ লাখ ৫৫ হাজার ৭৫৪ টন, গম তিন লাখ ১২ হাজার ৭৩ টন এবং ধান পাঁচ হাজার ২৩০ টন। ভাসমান মজুতসহ মোট মজুতের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫৭৪ টন। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে ধান, সেদ্ধ চাল, আতপ চাল ও গম মিলিয়ে মোট সংগ্রহ হয়েছে ১৮ লাখ চার হাজার দুই টন।


সরকারি সংগ্রহ ও মজুতের এ চিত্র খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা তুলে ধরলেও আমদানির প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি দূর হয়নি। দেশের খাদ্যশস্যের চাহিদা, উৎপাদনের ধরন, মৌসুমভিত্তিক সরবরাহ এবং বাজারের পরিস্থিতির ওপর আমদানির প্রয়োজন নির্ভর করে। বিশেষ করে গমের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। চালের ক্ষেত্রেও উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজন আমদানির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেশি হলেই যে সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, তা নয়। খাদ্যশস্যের ন্যায্য বণ্টন, সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সরবরাহ ব্যবস্থায় অপচয় রোধ এবং মানুষের ক্রয় ক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাদ্যের চাহিদা। অথচ নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খরা, বন্যা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ পানির নির্বিচার উত্তোলন এবং মাটির জৈব উপাদান কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতার জন্য উদ্বেগজনক।


এ অবস্থায় কৃষিতে উদ্ভাবন বলতে শুধু নতুন যন্ত্র বা উন্নত বীজের ব্যবহার বোঝায় না। মাটির গুণাগুণ অনুযায়ী সার প্রয়োগ, পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, রোগবালাই আগাম শনাক্তকরণ, ফসলের বহুমুখীকরণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষককে সঠিক পরামর্শ দেওয়াও উদ্ভাবনের অংশ। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন।


কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে খাদ্য উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে কৃষিতে উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।