নাটোরে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪, আহত অন্তত ৩০
নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী-শিশুসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বাস ও ট্রাকের দুই চালকও রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার সরকারপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রাথমিক তদন্তে অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে বাসটির সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ শেষ হয়েছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে। মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ নিয়ে বাসটি কীভাবে মহাসড়কে চলছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বরগুনা থেকে যাত্রী নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল ‘আরপি পরিবহন নাইট কোচ’ নামের বাসটি। অন্যদিকে, পঞ্চগড় থেকে বালু নিয়ে ঝিনাইদহের দিকে যাচ্ছিল একটি ট্রাক। ভোরে সরকারপাড়া এলাকায় পৌঁছালে যানবাহন দুটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে বাস ও ট্রাক দুটিই দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আরও কয়েকজন মারা যান। নিহত বাসচালক সোহেল রানা (৪০) রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের বাসিন্দা। ট্রাকচালক কালামের (৩৫) বাড়ি গ্রাম বরানগড়, থানা- বরাতলা, ঝিনাইদহ।
বনপাড়া হাইওয়ে থানা পুলিশ ও নাটোর ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে হতাহতদের উদ্ধার করে। বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন ও নাটোর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নিহতদের মরদেহ নাটোর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহতদের বড়াইগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, নাটোর সদর হাসপাতাল, স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ট্রাকটি মহাসড়কের বাম পাশের লেন দিয়ে চলছিল। এ সময় দ্রুতগতির বাসটি অন্য যানবাহনকে ওভারটেক করতে গিয়ে ট্রাকটির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসের যাত্রী আব্দুস সালামের অভিযোগ, বাসটিতে অতিরিক্ত যাত্রী ছিলেন। সব আসন পূর্ণ থাকার পাশাপাশি অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল এবং চালক মাঝেমধ্যে জোরে ব্রেক করছিলেন। এতে যাত্রীরা আসন থেকে ছিটকে পড়ছিলেন।
নিহতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে শালাল মোল্লা (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), গোদাগাড়ীর ফরহাদপুর গ্রামের বাসচালক সোহেল রানা (৪০), ট্রাকচালক কালাম (৩৫), রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০) এবং পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন (৮)। অন্যদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।
নাটোরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মাহাবুবুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার পর সকালে আহত নয়জন হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে দুজন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। বাকি সাতজনের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্য চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
দুর্ঘটনার পর বাসটির ফিটনেস সনদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। মঙ্গলবার দুপুরে সাংবাদিকদের নাটোরের জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ ছিল না। নাটোর বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাসটির ফিটনেস সনদের মেয়াদ চলতি বছরের ১৩ মে শেষ হয়েছে। তবে রুট পারমিটের মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের ১৩ মে পর্যন্ত। ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বাসটি কীভাবে চলাচল করছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতের নেতৃত্বে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার বলেন, কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার ও পুলিশ সুপার শরীফুল হক। জেলা প্রশাসক নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন। পুলিশ সুপার ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। দুর্ঘটনা রোধে পাবনা-বনপাড়া মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা ও আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সড়ক-মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে একের পর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল বন্ধ এবং সড়ক খাতের অনিয়ম ও সিন্ডিকেট ভেঙে নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।