বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬

শিবগঞ্জে রাতভর দাঁড়িয়েও সার পাননি কৃষক!

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪১ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৪১ অপরাহ্ন
শিবগঞ্জে রাতভর দাঁড়িয়েও সার পাননি কৃষক!

রবি শস্য আবাদের মৌসুম চলছে। জমি প্রস্তুত, বীজ বপনের অপেক্ষা। অথচ প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষকদের। কেউ রাত তিনটা থেকে, কেউ ভোর চারটা থেকে ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েও পাচ্ছেন না সার। অভিযোগ উঠেছে, সার বিতরণে অনিয়ম, সিন্ডিকেট ও দালালদের দৌরাত্ম্যের। বেশি দামে সার কিনতে গিয়ে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও কোথাও সার বিতরণ নিয়ে উত্তেজনা ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে।


সোমবার ও মঙ্গলবার (২৬ ও ২৭ অক্টোবর) উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিএপি সার না পাওয়ায় ভুট্টা ও সরিষাসহ বিভিন্ন রবি শস্যের বীজ বপন করতে পারছেন না তাঁরা। সময়মতো বীজ বপন করতে না পারলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, সারের কোনো সংকট নেই; চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।


সোমবার দুপুরে মনাকষা ঈদগাহ মোড়ে সার কিনতে আসা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে দুর্ভোগের চিত্র জানা যায়। মনাকষা ইউনিয়নের আলাউদ্দিনের ছেলে আব্দুল মালেকের সার ডিলারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাঙ্গামী গ্রামের সুফিয়া বেগম ও ইয়াসবানু। তাঁরা জানান, সোয়া তিন বিঘা জমিতে ভুট্টা ও সরিষা চাষের প্রস্তুতি নিয়েছেন। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও সার পাননি। তাঁদের মধ্যে একজন বলেন, ‘বিধবা হয়েও সকাল থেকে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু এখনো সার পাইনি।’


পারচৌকা গ্রামের টুটুল আলী জানান, ভুট্টা ও সরিষা চাষের জন্য তাঁর নয় বিঘা জমিতে নয় বস্তা ডিএপি সার প্রয়োজন। ১০ দিন আগে গ্রামের একজনের কাছ থেকে চোরাইপথে আসা দুই বস্তা সার বস্তাপ্রতি ২ হাজার ১০০ টাকা দরে কিনেছেন। সোমবার সকাল থেকে ডিলারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেও সার পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ডিলারকে সেখানে পাওয়া যাচ্ছিল না।


৮৮ বছর বয়সী নজরুল ইসলাম জানান, এক বস্তা ডিএপি সারের জন্য রাত তিনটা থেকে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ সার বিতরণের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। একই ধরনের অভিযোগ করেন খড়িয়াল গ্রামের ইয়াসিন আলী, বনকুল গ্রামের আব্দুস সাত্তার, টোকনা গ্রামের আবদুল লতিফ ও বিধবা মানুয়ারা বেগমসহ শতাধিক কৃষক। তাঁদের অভিযোগ, সার নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ডিলার আব্দুল মালেকের গুদামে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে ভেতরে সারির পর সারি সারের বস্তা দেখা গেছে। এ বিষয়ে ডিলারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


অন্যদিকে মনাকষা বাজারে আকবর মিয়ার ডিলারের গোডাউনের সামনেও দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। অগ্রণী ব্যাংকের নিচে অবস্থিত ওই গোডাউনে মনাকষা ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষকদের সার দেওয়ার কথা থাকলেও অন্য ইউনিয়নের লোকজন সার পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় কৃষকেরা। ঠুঠাপাড়া গ্রামের মাসিদুর রহমান বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে রবি শস্য চাষ করছি। অন্তত পাঁচ বস্তা ডিএপি সার প্রয়োজন। রাত চারটা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। এখন শুনছি, সার নেই।’ একই গ্রামের নুরুল ইসলাম, মুসাফিক, সুমন ও ইমন যথাক্রমে ছয়, পাঁচ, ২০ ও ছয় বিঘা জমিতে ভুট্টা ও সরিষা চাষের জন্য সার নিতে এসে রাত থেকে অপেক্ষা করছিলেন।


সার না পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতিতে পুলিশ এলেও কৃষকদের অভিযোগ নিরসনে কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। গণমাধ্যমকর্মীদেরও গোডাউনের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষকের অভিযোগ, স্থানীয় একটি চক্র ডিলারের ব্যবস্থাপককে ম্যানেজ করে বিতরণের শুরুতেই দালালদের মাধ্যমে ১০ থেকে ১২ বস্তা করে সার নিয়ে যাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।


এদিকে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া সারের সংকট ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। কিছু কৃষকের আগাম সার মজুতের প্রবণতা এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে কৃষি কার্ড বিতরণের প্রক্রিয়া চলছে; শিগগিরই তা কার্যকর হবে।


কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি রবি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ২৮ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে। নভেম্বর মাসের জন্য ১ হাজার ২৭৭ মেট্রিক টন ডিএপি, ৪৫০ মেট্রিক টন এমওপি, ২০৪ মেট্রিক টন টিএসপি ও ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া বরাদ্দ রয়েছে। অবৈধভাবে সার বিক্রি বন্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, গত দুই মাসে সাত থেকে আটটি অভিযানে প্রায় সোয়া তিন লাখ টাকা মূল্যের দুই শতাধিক বস্তা বিভিন্ন ধরনের সার উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।


শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী সার বিতরণ করা হচ্ছে। তবে কৃষকেরা যাতে সারবঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।


কৃষকদের অভিযোগ ও কৃষি বিভাগের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান থাকলেও মাঠপর্যায়ে সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত চাষিদের কাছে বরাদ্দের সার পৌঁছানোই এখন বড় প্রশ্ন। আবাদ মৌসুমে সময়মতো সার না পেলে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন কৃষকেরা।