সোমবার, নভেম্বর ০২, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে লড়াইয়ে রেকর্ড ১২৫ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ

সোনার দেশ ডেস্ক ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০২:৩৪ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০২:৩৪ অপরাহ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে লড়াইয়ে রেকর্ড ১২৫ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ
মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন স্বাস্থ্যসেবা খাতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আব্দুল এল-সায়েদ, অ্যামি অ্যাক্টন, জেভিয়ার বেসেরা ও ক্রিস্টিন হুক। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে চিকিৎসক, নার্স ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ ঐতিহাসিকভাবেই তুলনামূলক কম। কিন্তু এবার চিত্রটি বদলেছে। দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত ১২৫ জন চিকিৎসক, নার্স ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রার্থী হয়েছেন, যা রেকর্ড সংখ্যক বলা যায়।


সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, চিকিৎসা খাতের অনেকেরই রাজনীতিতে আসার পেছনে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে কোভিড-১৯ মহামারি। মহামারির সময় স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রভাব এবং সরকারি নীতিনির্ধারণে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের ভূমিকার গুরুত্ব তাঁদের নতুন করে রাজনীতির দিকে টেনেছে।


মহামারির শুরুতে চিকিৎসকদের নানা দিক থেকে সম্মান জানানো হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের অনেকেই কাজের চাপ, ব্যক্তিগত বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক বিরোধের মুখে পড়েন। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও জনস্বাস্থ্য নির্দেশনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে কোনো কোনো চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে হুমকি ও বাধারও সম্মুখীন হতে হয়। কয়েকজন প্রার্থীর মতে, মহামারির সময় তাঁরা উপলব্ধি করেন, সরকারের সিদ্ধান্ত ও রাজনীতির সঙ্গে স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানচর্চার সম্পর্ক কতটা গভীর।


মিশিগানের ওয়েন কাউন্টির সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক ও রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ড. আবদুল আল-সায়েদ। চিকিৎসক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে একজন অসুস্থ বা যন্ত্রণায় থাকা মানুষের পাশে বসে তাঁর কথা শোনা এবং নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে তাঁকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা শেখানো হয়। রাজনীতিতেও একই ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়।


এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে লড়ছেন স্বাস্থ্য খাতের একাধিক পরিচিত মুখ। ওহাইওতে রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইনের মেয়াদে আলোচিত জনস্বাস্থ্য পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা প্রতিরোধমূলক ওষুধ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যামি অ্যাক্টন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর প্রতিপক্ষ বায়োটেক খাতের কোটিপতি রিপাবলিকান প্রার্থী বিবেক রামাস্বামী।


ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদে লড়ছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের (এইচএইচএস) সচিবের দায়িত্ব পালন করা ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জাভিয়ার বেসেরা। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান মিডিয়া ব্যক্তিত্ব স্টিভ হিলটন।


অন্যদিকে, সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান সিনেটর ডার্লিন গ্র্যামের বিরুদ্ধে সিনেট নির্বাচনে লড়ছেন শিশু বিশেষজ্ঞ ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ড. অ্যানি অ্যান্ড্রুজ।


স্বাস্থ্য খাতে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিরাও এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নিউ হ্যাম্পশায়ারের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন স্বাস্থ্য খাতবিষয়ক আইনজীবী ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিন্দে ওয়ার্মিংটন। অন্যদিকে জর্জিয়ায় গভর্নর পদে লড়ছেন জ্যাকসন হেলথকেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিপাবলিকান প্রার্থী রিক জ্যাকসন।


রাটগার্স ইউনিভার্সিটির ‘ইগলটন সেন্টার অন দ্য আমেরিকান গভর্নর’-এর পরিচালক ও ইতিহাসবিদ ড. ক্রিস্টোফার শিল্ডস বলেন, তিনি আগে কখনো রাজনীতিতে এমন ঘটনা দেখেননি। রাজনীতি ও বিজ্ঞানের মধ্যে যোগসূত্র বরাবরই কিছুটা দুর্বল ছিল বলে মনে করেন তিনি।


যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের বর্তমান সদস্যদের ১০ শতাংশেরও কমের চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য বা প্রকৌশল বিষয়ে ডিগ্রি রয়েছে। বিপরীতে, সিনেটরদের ৪৭ শতাংশ এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৩১ শতাংশ সদস্যের আইনি ডিগ্রি রয়েছে। সিনেটে বর্তমানে চিকিৎসা খাতের চারজন সদস্য রয়েছেন। তাঁরা সবাই রিপাবলিকান ও পেশায় চিকিৎসক। তাঁরা হলেন ওয়াইওমিংয়ের জন বারাসো, লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিডি, ক্যানসাসের রজার মার্শাল এবং কেন্টাকির র‍্যান্ড পল।


প্রতিনিধি পরিষদে রয়েছেন ১৭ জন চিকিৎসক, চারজন ডেন্টিস্ট, দুজন ফার্মাসিস্ট, একজন নার্স প্র্যাকটিশনার, একজন অপটোমেট্রিস্ট এবং একজন পুনর্বাসন থেরাপিস্ট। রাজ্য পর্যায়ে স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞান খাতের পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ আরও কম। রাটগার্স ইউনিভার্সিটির ‘সায়েন্টিস্টস ইন স্টেট পলিটিক্স ডাটাবেস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত রাজ্য আইনপ্রণেতাদের মাত্র ৩ শতাংশের চিকিৎসা, বিজ্ঞান বা প্রকৌশল বিষয়ে পেশাগত পটভূমি ছিল। আগের বছরের তুলনায় এই হার ২৫ শতাংশ কম।


বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র চিকিৎসক গভর্নর হাওয়াইয়ের জশ গ্রিন। অন্য কোনো গভর্নরের জনস্বাস্থ্য বিষয়ে ডিগ্রি নেই। দেশটির ইতিহাসে কোনো চিকিৎসক প্রেসিডেন্টও হননি। নবম প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হেনরি হ্যারিসন অবশ্য মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে পরে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।


রাজনীতিতে আগ্রহ বাড়ার কারণ

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে পেশাগত পটভূমি থাকা ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনে অংশ নিতে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয় ‘৩১৪ অ্যাকশন’ নামের একটি সংস্থা। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক এরিক পোলিয়াক জানান, এ বছর তাঁদের কাছে প্রার্থী হতে আগ্রহীদের আবেদনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁরা ৭০০টির বেশি আবেদন পেয়েছেন। অন্য নির্বাচনী চক্রগুলোতে সাধারণত এ সংখ্যা ২০০-এর কাছাকাছি থাকে।


আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনও (এএমএ) দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। পেশাজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে সংগঠনটির প্রার্থী কর্মশালা ও ক্যাম্পেইন স্কুল নামে দুটি রাজনৈতিক শিক্ষা কর্মসূচিও রয়েছে। সিনেটর বিল ক্যাসিডি ও জন বারাসোর পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য অমি বেরা এবং মারিয়ানেট মিলার-মিকসও এসব কর্মসূচির সাবেক শিক্ষার্থী।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও রাজনীতিতে আসার আগ্রহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এবং গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের সাবেক কর্মকর্তা ড. ক্রিস্টিন হুক জানান, এক বছর আগেই মানুষ তাঁর কাছে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ চাইতে শুরু করে। ২০২৪ সালে টেক্সাসের ২১তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হন। এবার আবারও একই আসন থেকে লড়ছেন।


হুক বলেন, সারা দেশ থেকে অনেকেই নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছেন এবং তাঁর নির্বাচনী অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে আসা বহু জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার তাগিদ থেকেই তাঁদের অনেকে রাজনীতিতে আসছেন।


হুকের নিজের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পেছনেও রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের বিজ্ঞানবিরোধী নীতির বিরোধিতা। তাঁর অভিযোগ, হাজার হাজার সরকারি চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোটি কোটি ডলারের গবেষণা তহবিল কমানো হয়েছে এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন তথ্যভান্ডার ও ওয়েবসাইট মুছে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া সুপেয় পানিতে ফ্লোরাইড মেশানো এবং শিশুদের টিকাদানের মতো দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্য কর্মসূচিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।


স্বাস্থ্যসেবা এখন সাধারণ মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দামের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়েও তাঁরা চিন্তিত। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ‘বিগ বিউটিফুল বিল’-এর কারণে আরও অন্তত ১ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা হারাতে পারেন। দেশটির ইতিহাসে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা কমানোর ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় ধাক্কা হতে পারে।


বিভিন্ন জরিপে স্বাস্থ্য খাতের প্রার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। সাবেক এইচএইচএস সচিব জাভিয়ার বেসেরাও বর্তমান নেতৃত্বের বিজ্ঞানবিরোধী অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, দেশের সেরা বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সরিয়ে দেওয়া বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সাইক্লোন বা মহামারির মতো দুর্যোগ মোকাবিলাই যেখানে কঠিন, সেখানে মানুষের তৈরি নতুন সংকট যুক্ত হলে মার্কিন জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে পড়বে।


মহামারির রাজনীতি ও অবিশ্বাস

এবারের নির্বাচনে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পেছনে কোভিড মহামারির প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব কাউন্টি অ্যান্ড সিটি হেলথ অফিশিয়ালসের প্রধান নির্বাহী লরি ট্রেমেল ফ্রিম্যান বলেন, মহামারির সময় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা সামলে ওঠা বা তা থেকে শিক্ষা নেওয়া তাঁদের অনেককে আরও শক্তিশালী করেছে।


সাধারণত জনস্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তারা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে কাজ করেন। কিন্তু মহামারি তাঁদের টেলিভিশনের পর্দায় নিয়ে আসে। কারও কারও জন্য এই পরিচিতি বয়ে আনে মৃত্যুর হুমকি ও বিদ্বেষ। এমন পরিস্থিতিতে রেকর্ডসংখ্যক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দেন। আবার কেউ কেউ নিজ নিজ এলাকায় মানুষের কাছে নায়ক হয়ে ওঠেন।


ওহাইওর সাবেক জনস্বাস্থ্য পরিচালক অ্যামি অ্যাক্টনও মহামারির সময় দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর বাড়ির সামনে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ করলেও অঙ্গরাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি বেশি সমর্থন পেয়েছিলেন। গভর্নর মাইক ডিওয়াইনের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত ব্রিফিং দেখতেন অনেকে। মহামারির সময় তাঁর ছবি গেঞ্জি ও দেয়ালচিত্রে ছড়িয়ে পড়ে। টিশার্ট ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও তাঁর প্রতি সমর্থন দেখা যায়। ডেইটন ডেইলি নিউজ তাঁকে মহামারির সময় ওহাইওর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। ২০২০ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে তাঁকে এমন নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যাঁকে সবাই পেতে চাইত।


অ্যাক্টনের ভাষ্য, বিদ্বেষের চেয়ে অঙ্গরাজ্যের মানুষের ভালোবাসার শক্তি ছিল অনেক বেশি। গভর্নর ডিওয়াইনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে সম্মানের ছিল। তাঁরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানুষের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।


তবে মহামারির সময় টিকাদান নীতি, মাস্ক পরার বাধ্যবাধকতা এবং স্কুল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ভোটারদের সমর্থন পাওয়া স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের জন্য সহজ হবে না। রিপাবলিকান রাজনীতিবিদদের পরামর্শক উডরো জনস্টন বলেন, কোভিডের পর বিশেষ করে রিপাবলিকান সমর্থকদের মধ্যে চিকিৎসা পেশার প্রতি বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। অনেকের ধারণা, সরকারি বিধিনিষেধ ও লকডাউনের সময় তাঁদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল বা ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল।


বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা বিজ্ঞানীদের বেশি বিশ্বাস করেন। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা গেছে, মহামারির সময় বিজ্ঞানীদের প্রতি মানুষের আস্থা কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা বেড়েছে। ২০২৬ সালের আরেকটি জরিপে দেখা যায়, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী কিংবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তুলনায় বিজ্ঞানীরা জনস্বার্থে কাজ করবেন—এমন বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশি।


ফ্রিম্যানের মতে, জনস্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তাদের কাজের একটি বড় অংশই হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা পেরিয়ে সমাধান বাস্তবায়ন করা। কিন্তু এই কাজের জন্য কতটা রাজনৈতিক দক্ষতার প্রয়োজন হয়, তা অনেকেই বোঝেন না। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য খাতের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রাজনীতিতে এলে শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও উপকার হতে পারে। কারণ, সুস্থতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।


রিপাবলিকান প্রার্থীদেরও স্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে অভিজ্ঞতার গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন উডরো জনস্টন। তিনি জানান, সম্প্রতি চিকিৎসা বা জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকা রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনে জেতাতে সহায়তা করছেন। এ ধরনের প্রার্থীরা নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির ভোটারের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ তৈরি করতে পারেন। তাঁর ভাষায়, কখনো কখনো বিজ্ঞ মানুষেরা আরেকজন বিজ্ঞ মানুষকে পছন্দ করেন।


রাজনীতিতে কেন বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন

ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার শিল্ডস মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিজ্ঞানীদের কারিগরি দক্ষতা এখন সময়ের দাবি। স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতার মতো সমস্যার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কীভাবে নিরাপদ করা যায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে বাড়ানো যায় এবং জলবায়ু সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়—এমন জটিল প্রশ্নও সামনে রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে নীতিনির্ধারণের জায়গায় বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের উপস্থিতি প্রয়োজন।


অ্যামি অ্যাক্টনের মতে, উচ্চপর্যায়ের সরকারি পদে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের উপস্থিতি কেবল একজন চিকিৎসকের রোগী দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা সামগ্রিকভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, চিকিৎসা ও প্রযুক্তির উন্নতির বাইরেও মানুষের গড় আয়ু ও জীবনমান বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের বড় অবদান রয়েছে।


বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাবার, শিশুশ্রমবিরোধী আইন, সবার জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা এবং সড়ক নিরাপত্তা আইন—এসব উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে অ্যাক্টন বলেন, মানুষের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। কোভিডের সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, একজন গভর্নরের কাজও অনেকটা চিকিৎসকের মতো। চিকিৎসক যেমন সব রোগীর জন্য কাজ করেন, তেমনি একজন গভর্নরের দায়িত্ব হলো মানুষের সামাজিক,

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটিয়ে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ তাই শুধু নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘটনা নয়। তাঁদের অনেকের কাছে এটি বিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ও মানুষের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় সরাসরি ভূমিকা রাখার সুযোগ। মহামারির অভিজ্ঞতা তাঁদের সামনে সেই প্রয়োজন আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।


তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা অনলাইন