শুক্রবার, নভেম্বর ০৬, ২০২৬

‘নীরব’ রাজশাহীতে ভয়ঙ্কর শব্দদূষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১০:২৫ অপরাহ্ন
‘নীরব’ রাজশাহীতে ভয়ঙ্কর শব্দদূষণ

‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটক। অথচ সেখানেই থেমে থাকা গাড়ি থেকে একের পর এক বাজছে হর্ন। হাসপাতালের ভেতরে ঢুকছে অটোরিকশা, সেখান থেকেও ভেসে আসছে হর্নের শব্দ। নিরাপত্তাকর্মীদের বাঁশির শব্দও যোগ হচ্ছে এর সঙ্গে। রোগী ও স্বজনদের শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা যে এলাকায়, সেখানে দিনের ব্যস্ত সময়ে তৈরি হচ্ছে শব্দের তীব্র কোলাহল।


শুধু হাসপাতাল নয়, লক্ষ্মীপুর এলাকার আশপাশে রয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস, বিভাগীয় গণগ্রন্থাগার ও একটি উচ্চবিদ্যালয়। রাস্তার দুই পাশে রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক। পরিবেশ অধিদপ্তর হাসপাতালসহ এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশের এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবে সেখানে নিয়মিতই উচ্চ শব্দে হর্ন বাজানো হচ্ছে।


রাজশাহী নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের চিত্রও একই। তালাইমারী, রেলগেট, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, ভদ্রা, ঢাকা বাসস্ট্যান্ড ও আমচত্বর এলাকায় যানজটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপ্রয়োজনীয় হর্নের ব্যবহার। কোথাও যাত্রী তোলার জন্য, কোথাও পথচারীকে সরাতে, আবার কোথাও যান চলাচলের জায়গা করে নিতে চালকরা হর্ন ব্যবহার করছেন। অনেক চালকের কাছে গাড়ি চালানো আর হর্ন বাজানো যেন একই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।


২০২২ সাল থেকে রাজশাহী নগরের শব্দের মাত্রা পরিমাপ করছে বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সংগঠনটির পরিমাপ করা তথ্য বলছে, নগরের বিভিন্ন এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। শহরের শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর (রেলগেট) এর একটি উদাহরণ। ২০২২ সালে সেখানে শব্দের মাত্রা ছিল ৯০ ডেসিবেল। গত মে মাসে একই স্থানে পরিমাপ করে পাওয়া গেছে ৯৭ দশমিক ২ ডেসিবেল। অর্থাৎ চার বছরে শব্দের মাত্রা বেড়েছে ৭ দশমিক ২ ডেসিবেল।


শব্দের এই মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কতটা বেশি, তা বোঝা যায় সরকারি নির্ধারিত সীমার সঙ্গে তুলনা করলে। বাংলাদেশ শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতের আশপাশের ১০০ মিটার এলাকা নীরব এলাকা হিসেবে বিবেচিত। এসব এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই হিসাবে রেলগেটের ৯৭ দশমিক ২ ডেসিবেল শব্দমাত্রা নির্ধারিত দিনের সীমার প্রায় দ্বিগুণ।


বিধিমালায় আবাসিক এলাকায় দিনের বেলা ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল এবং বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দমাত্রা অনুমোদিত।


কিন্তু নগরের ব্যস্ত সড়ক ও মোড়গুলোর বাস্তব চিত্র এসব সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তালাইমারী মোড়ে দেখা যায়, একটি যাত্রীবাহী বাস সেখানে থামার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ শব্দে হর্ন বাজায়। প্রায় ৫ থেকে ৭ মিনিট ইঞ্জিন চালু রেখে দাঁড়িয়ে থাকার সময় আরও দুইবার হর্ন বাজানো হয়। পরে বাসটি ছেড়ে যাওয়ার সময়ও বাজানো হয় হর্ন।


কেন দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হর্ন বাজানো হচ্ছে- জানতে চাইলে ওই বাসের চালক মোসলেম আলী বলেন, যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তিনি হর্ন বাজিয়েছেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, গাড়ি চালানোর সময় হর্ন বাজানো তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।


তালাইমারী মোড়ের পাশেই রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট)। সড়কের শব্দ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরেও পৌঁছায়।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন বলেন, চালকরা অনেক সময় অপ্রয়োজনেই হর্ন বাজান। বাস ও অটোরিকশার পাশাপাশি মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন থেকেও হর্নের শব্দ আসে।


তার অভিযোগ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান বা জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ে না।


নগরের ভদ্রা মোড়েও দেখা যায় একই চিত্র। সেখানে একসঙ্গে পাঁচ-সাতটি বাস দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় চালকরা প্রায়ই হর্ন বাজান। একইভাবে ঢাকা বাসস্টেশন, রেলগেট ও আমচত্বর এলাকায় বড় যানবাহন ও ট্রাকের উচ্চ শব্দের হর্নে পরিবেশ কেঁপে ওঠে।


রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি এক স্বজনের সঙ্গে থাকা রফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ঢোকার পরও গাড়ির শব্দ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। থেমে থাকা গাড়িও হর্ন বাজায়। এতে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। হাসপাতালের ভেতরে অটোরিকশা হর্ন দেয়, আনসার সদস্যরাও বাঁশি বাজান। অন্তত হাসপাতালের সামনের অংশে হর্ন বন্ধ রাখা উচিত।


পরিবেশকর্মীদের মতে, কয়েক বছর আগেও রাজশাহী নগরে শব্দদূষণের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। কিন্তু নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিভিন্ন নির্মাণকাজ, অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, যানজট, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং জনসচেতনতার অভাবে শব্দদূষণ বাড়ছে।


বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, গত চার বছরের মধ্যে তিন বছর তারা নগরের পাঁচটি এলাকায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করেছেন। প্রতিবারই বিভিন্ন এলাকায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি শব্দ পাওয়া গেছে। রেলগেট, তালাইমারী, সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট ও লক্ষ্মীপুর মোড়ে যানজট বেশি হওয়ায় শব্দদূষণও বেশি হয়।


তিনি আরও বলেন, অনেক চালকের কাছে গাড়ি চালানো মানেই হর্ন বাজানো। এই অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য চালকদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। শুধু অভিযান চালিয়ে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষ—সব পক্ষকেই সচেতন হতে হবে।


শব্দদূষণ কমাতে সবুজায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই পরিবেশকর্মী। তার মতে, গাছ শব্দের প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে। আমের শহর রাজশাহীতে আম, জাম, নিম ও সজনে ধরনের গাছ বেশি করে লাগানো হলে ভবিষ্যতে শব্দ ও বায়ুদূষণ কমাতে তা ভূমিকা রাখতে পারে।


রাজশাহীতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তরও অভিযান পরিচালনা করছে। জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন এলাকায় ২৮টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং ১২৪টি হাইড্রোলিক হর্ন জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহনের চালক, ইমাম ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালাও করা হয়েছে।


রাজশাহী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কবির হোসেন বলেন, রাজশাহী নগর আয়তনে ছোট হলেও এখানে যানবাহনের সংখ্যা অনেক। নিবন্ধনের বাইরে থাকা অটোরিকশার সংখ্যাও কম নয়। নগরের ভেতরে একাধিক বাস টার্মিনাল রয়েছে। এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় বিভিন্ন স্থানে যানজট তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। সব মিলিয়ে শব্দদূষণ বাড়ছে।


তিনি বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করছে। তবে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। জনসচেতনতা ছাড়া শব্দদূষণ কমানো কঠিন।


এদিকে বিশ্বের শব্দদূষণের চিত্র নিয়েও উদ্বেগজনক তথ্য রয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত ‘ফ্রন্টিয়ারস ২০২২: নয়েজ, ব্রেজেস অ্যান্ড মিসম্যাচেস’ প্রতিবেদনে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহীকেও বিশ্বের অন্যতম শব্দদূষণকারী শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে রাজশাহীর শব্দমাত্রা ১০৩ ডেসিবেল দেখানো হয়। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর রাজশাহীতে স্থানীয়ভাবে শব্দের মাত্রা পরিমাপের উদ্যোগ নেয় বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা।


সংগঠনটির স্থানীয় পরিমাপগুলোতে ১০০ ডেসিবেলের বেশি শব্দমাত্রা নিয়মিত পাওয়া না গেলেও অনেক স্থানেই তা বিপজ্জনকভাবে উচ্চ। রেলগেটের চার বছরের তথ্যই দেখাচ্ছে, শব্দের মাত্রা কমার বদলে বাড়ছে। অথচ হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকার মানুষের জন্য শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা। বাস্তবে নীরব এলাকা ঘোষণার পরও যদি হাসপাতালের সামনে থেমে থাকা গাড়ি হর্ন বাজায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে যানবাহন থেকে উচ্চ শব্দ ছড়ায় এবং ব্যস্ত মোড়গুলোতে হর্নের প্রতিযোগিতা চলে, তাহলে শুধু বিধিমালা থাকলেই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।