সোমবার, আগস্ট ২৪, ২০২৬

রাণীনগরে গ্রাম্য সালিশে চিকিৎসার খরচ হিসেবে দেড় লাখ টাকা জরিমানা ধার্য

WP Import ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন
WP Import ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন
রাণীনগরে গ্রাম্য সালিশে চিকিৎসার খরচ হিসেবে দেড় লাখ টাকা জরিমানা ধার্য
রাণীনগরে গ্রাম্য সালিশে চিকিৎসার খরচ হিসেবে দেড় লাখ টাকা জরিমানা ধার্য


নওগাঁ প্রতিনিধি:


নওগাঁর রাণীনগরে গ্রাম্য সালিশে চিকিৎসার খরচ বাবদ এক পরিবারের দেড় লাখ জরিমানা ধার্য করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে উপজেলার রঞ্জনিয়া গ্রামে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ওই গ্রামের বিএনপি পন্থি গ্রাম্য মাতবরদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষনা করা হয়।

এমন ঘটনা ওই এলাকায় দীর্ঘদিন যাবত চলে আসা কতিপয় গ্রাম্য মাতবরদের একটি সিন্ডিকেটের গ্রাম্য সালিশের নামে নৈরাজ্যকে আরো উজ্জীবিত করবে বলে মনে করছে সচেতন মহল।

রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে গ্রাম্য সালিশে হাজির না হওয়ায় রঞ্জনিয়া গ্রামের রশিদুল ইসলামের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও পরিবারের সদস্যদের তালাবদ্ধ করে রাখে ওই গ্রামের কতিপয় ব্যক্তিরা। এসময় হামলাকারীরা বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ দু’টি বৈদ্যুতিক মিটার ভাঙচুর ও পানির লাইন বন্ধ করে দেয়। পরের দিন সোমবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হলে দুপুর ১টার দিকে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের তালাবদ্ধ (আবদ্ধ) থেকে মুক্ত করে।

রশিদুলের ভাই নিকিদুল ইসলাম বলেন, তার বড় ভাই রেজাদুল ইসলাম ও ভাবির মধ্যে মনোমানিল্য হবার কারণে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছিলো ভাবি। চলতি মাসের ৭ তারিখে বাবা আলেফ হোসেন মারা গেলে দাফন-কাফনের জন্য ভাবি এসে বাড়িতে উঠতে চাইলে পরিবারের সদস্যরা বাধা দেয়। এরপর দাফন শেষ হলে আবারো ভাবি বাড়িতে উঠতে চাইলে ভাবির খালাতো ভাই রঞ্জনিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলামের সাথে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মারপিটের ঘটনা ঘটে।

এরই জেরধরে ওই দিন দুপুরে আবারো সাইফুল ইসলাম ও রশিদুলের স্বজনদের মধ্যে মারপিটের ঘটনা ঘটে। পরে বিষয়টি নিয়ে মিমাংসার কথা হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই রোববার বিকেলে লোকমারফত খবর দেওয়া হয় রাতেই সালিশ বৈঠক হবে। এরপর সন্ধ্যায় আবারো কয়েকজন এসে জানায় রাতেই বৈঠক হবে এবং হাজির থাকতে হবে। এ সময় বৈঠকের দিন পরিবর্তন করার কথা বললেও তারা কোন কথা শোনেনি। রাতেই বৈঠক বসে আমাদেরকে আবারো হাজির হতে বলে।

তিনি আরও বলেন, সালিশে হাজির না হওয়ায় ইউনুস আলী, ফিরোজ হোসেন, আতোয়ার হোসেনসহ গ্রামের লোকজন এসে বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় জরুরি সেবা নাম্বার ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ এসে রাত ১টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত করে চলে যায়। পুলিশ চলে যাবার পর রাত তিনটার দিকে আবারো লোকজন হামলা চালিয়ে বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ খুঁটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় এবং দু’টি মিটার ভাঙচুর করে। এছাড়া পানির লাইন বন্ধ করে দিয়ে বাড়ির বাহিরে মেইন গেটে তালা দিয়ে আবদ্ধ করে রাখে।

জানতে চাইলে গ্রাম্য মাতবর ইউনুস আলী ও আতোয়ার হোসেন বলেন, রশিদুলের ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে দ্বন্দে¦র জেরধরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০জন ভারাটিয়া লোকজন এনে গ্রামের সাইফুলের উপর হামলা ও মারপিট করে গুরুত্বর আহত করে রশিদুলরা। সাইফুলকে প্রথমে রাণীনগর এবং পরে বগুড়া হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হয়।

এ ঘটনাটি সমাধানের জন্য রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) রাতে গ্রামে সালিশ ডাকা হয়েছিল। কিন্তু রশিদুল ও তার পরিবারের লোকজন সালিশে হাজির না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে গ্রামের কোন লোকজন তাদের বাড়িতে হামলা বা মিটার ভাঙচুর কিম্বা তালাবদ্ধ করেনি। এগুলো রশিদুলের লোকজন করে আমাদের উপর মিথ্যা অপবাদ।

পরবর্তিতে অনেক নাটকীয়তার পর উভয় পক্ষই বিষয়টি গ্রামে বসেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান করবেন মর্মে গত শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলা বিএনপির পদধারী নেতৃবৃন্দরা বিকেলে একটি গ্রাম্য সালিশের আয়োজন করে। সেই সালিশে মারপিটে গুরুত্বর আহত সাইফুলের চিকিৎসা খরচ বাবদ রশিদুলের পরিবারকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করে গ্রাম্য সালিশের বিচারকগণ। জরিমানার টাকায় যদি সাইফুলের চিকিৎসা না হয় তাহলে উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস প্রদান করা হয়।

স্থানীয় মেম্বার এবাদুল হক মুঠোফোনে জানান যদিও বা গ্রাম্য সালিশ সম্পন্ন অবৈধ তবুও গ্রামের শান্তি বজায় রাখার জন্য গ্রাম্য সালিশে উপজেলা বিএনপির পদধারী ব্যক্তিরা গ্রামের মাতবরদের সহযোগিতায় আহত সাইফুলের চিকিৎসার খরচ হিসেবে দেড় লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করেছেন।

সালিশের বিচারক উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোসারব হোসেন মুঠোফোনে জানান গ্রামের অস্থিতিশীল পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যেই গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অন্যান্য গ্রামবাসীদের অংশগ্রহণে একটি সালিশের মাধ্যমে মারপিটে গুরুত্বর আহত সাইফুলের চিকিৎসার জন্য দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যদি ওই টাকায় সাইফুলের চিকিৎসা না হয় তাহলে উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে সহযোগিতা প্রদানের কথা জানান এই বিচারক।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হাফিজ মো: রায়হান জানান বিষয়টি জানার পর তিনি ওই গ্রামে পুলিশ সদস্য পাঠিয়ে তালাবদ্ধ পরিবারকে মুক্ত করে। পুরো গ্রামবাসী রশিদুলের পরিবারের বিপক্ষে। তাই পরবর্তিতে যেন কোন অশান্তি সৃষ্টি না হয় সেই লক্ষ্যে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের পরামর্শ প্রদান করা হয়। তবে শুক্রবার বিকেলে গ্রাম্য সালিশে জরিমানা করার বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান এই কর্মকর্তা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান জানান গ্রাম্য সালিশ করার কোন সুযোগ নেই। যে কোন সমস্যা সমাধান করার জন্য সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে গ্রাম আদালত স্থাপন করেছে। তাই গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে কারো জরিমানা আদায় করার কোন সুযোগ সেই। এমন ঘটনায় অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।