রাজনৈতিক কিংবা মব ছাড়িয়ে শিশু হত্যার সংখ্যা বেশি
শিশু আছিয়া গত বছর বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় তার বোনের শ্বশুর বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করে আছিয়ার মা। তিনি অভিযোগ করে বলেন, মেয়ের স্বামীর সহায়তায় তার বাবা (শ্বশুর) শিশুটিকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি মেয়ের শাশুড়ি ও ভাসুরও জানতো। তারা ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুটিকে হত্যাচেষ্টা চালায়।
আছিয়াকে প্রথমে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এরপর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচে) নেওয়া হয় তাকে। কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে একাধিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর গত বছরের ১৩ মার্চ চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
২০২৪ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকের ওয়াল বিষাদময় হয়ে উঠেছিল ফুলের মতো ছোট্ট শিশু মুনতাহাকে হত্যার ঘটনায়। ৫ বছর বয়সী সিলেটের এই শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। গুম করতে লাশ ফেলা হয় ডোবায়। শিশু মুনতাহাকে অপহরণ ও নির্মমভাবে হত্যা পরিকল্পনা করে তাই প্রতিবেশী গৃহশিক্ষক।
কেবল আছিয়া বা মুনতাহা নয়, রাজনৈতিক, মব ও কারা-হেফাজতে মৃত্যুর তুলনায় প্রতিবছর শিশু হত্যার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেশি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে রাজনৈতিক হত্যা ১৫৭, মবের ঘটনা ২৮টি, কারা হেফাজতে মৃত্যু ৮১ হলেও শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৫৯৬টি। মানবাধিকার এই সংগঠনটির তথ্য বলছে, ২০২২ সালে রাজনৈতিক হত্যা ৭০, মবের ঘটনায় হত্যা ৩৬টি, কারা হেফাজতে মৃত্যু ৬৫ হলেও সে বছর শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৫১৬টি। ২০২৩ সালে সেই সংখ্যা ৪৮৫ হলেও পরের বছর ২০২৪ সালে এসে ৫৭৫ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ৪১০টি পৌঁছেছে—যেখানে রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা ১০২টি।
জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
কেন প্রতি বছর এত সংখ্যক শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে প্রশ্নে শিশু অধিকারকর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর শিশুদের যেভাবে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটছে, বিশেষ করে ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরণের পর হত্যা ও নির্মম নির্যাতনের ঘটনা, তা শিশুদের জন্য মানবাধিকার সংকটের বহিঃপ্রকাশ। শিশুদের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু রোধে রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন তারা। কোনও সভ্য সমাজে শিশুদের প্রতি এই অবিচার হতে পারে না।
‘শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সুরক্ষায়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে তারাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ বলে মনে হচ্ছে’ উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘‘শিশুদের এই হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। বরং আমাদের দেশে বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় ও দুর্বল শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার ফল হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
’’ তিনি বলেন, ‘‘দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা বারবার একই ধরনের সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ আগাম সংকেত দেখেও নীরব থাকে, যা অপরাধকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। দারিদ্র্য, শিশু শ্রম, পথশিশুদের অসুরক্ষিত জীবন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে শিশুদের সহজ টার্গেটে পরিণত হওয়াও এই মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’’
শিশুদের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু রোধে রাষ্ট্রকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘শিশু নির্যাতন ও হত্যার মামলায় দ্রুত বিচার, শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা কাঠামো, পরিবার ও কমিউনিটির সক্রিয় নজরদারি এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক ও ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের জীবন রক্ষা করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়। কাজেই, শিশুদের সুরক্ষায় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’’
রাজনৈতিক, মব কিংবা কারা হেফাজতে মৃত্যুর চেয়ে শিশু হত্যার ঘটনা প্রতিবছরই বেশি হওয়ার কারণে উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই হত্যার ঘটনা যদি পারিবারিক কারণে বেশি হয়, তাহলে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে আমার মনে হয়, আমাদের সমাজে যে পরিবর্তন আসছে, সেখানে বেশ কিছু বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে। স্বজনের সন্তানকে অপহরণ, আত্মীয়দের মধ্যে হত্যাকাণ্ড সে কারণে বাড়তে পারে। আধুনিকতার উত্থান ও সামাজিক পর্যায়ে সুশীলরূপ দিতে না পারায় পারিবারিক হত্যা ঘটে থাকতে পারে। সভ্যতার দিক থেকে আমরা যে অনেক পেছনে, সেটা এই পরিসংখ্যানে ফুটে উঠছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘শিশুর সঙ্গে কেউ না থাকলে সে ধর্ষণের শিকার হবে, হত্যার শিকার হবে, অপহরণের শিকার হবে—এটা কোনও সভ্য সমাজের চিত্র না। যখন এরকম হচ্ছে, তখন রাষ্ট্র শিশুকে অনিরাপদ ঘোষণা না করাটা তার ব্যর্থতা।’’
পত্রিকা থেকে নেওয়া তথ্যের ওপরে ভিত্তি করে সংখ্যা নির্ধারণে কিছু ঝুঁকি আছে উল্লেখ করে অধিকারকর্মী গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘‘শিশুদের প্রতি সহিংসতা বেড়েছে এটা সত্য। বড় মানুষের প্রতি সহিংসতা করলে মামলা, জেল জরিমানার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শিশুর ক্ষেত্রে এমন হয় না।’’ ‘বাংলাদেশে কোনও শিশু নিহত হয় না’ বলে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘শিশু হত্যার শিকার হোক, মৃত্যুর শিকার হোক—তার মৃত্যুর নিবন্ধন হয় না। কারণ সে আমাদের পরবর্তী জীবনে আর প্রয়োজনীয় না।
শিশুদের মৃত্যুকে আমরা গুরুত্ব দিই না বলে প্রতিশোধ নিতে, নিজেদের রাগ ঘৃণা চরিতার্থ করতে শিশুকে হত্যা করা হয়। একজন শিশু হত্যার শিকার হলে তার বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া হয়। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই বড় ধরনের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।’’
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন