রবিবার, জুন ২১, ২০২৬

মিশ্র চাষে নতুন দিগন্ত, রাজশাহীতে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৭ অপরাহ্ন
মিশ্র চাষে নতুন দিগন্ত, রাজশাহীতে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা

রাজশাহী অঞ্চলে মিশ্র চাষ পদ্ধতি দিন দিন জনপ্রিয় ও লাভজনক হয়ে উঠছে। একই জমিতে ফলগাছের পাশাপাশি সবজি ও অন্যান্য ফসল একসঙ্গে চাষ করে কৃষকরা যেমন আয় বাড়াচ্ছেন, তেমনি জমির উর্বরতা ও পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় রাখতে পারছেন। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মিশ্র চাষ যুক্ত হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।


বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলে আম, মাল্টা, লেবু, পেয়ারা ও ড্রাগন ফলের মতো অর্থকরী ফলগাছের সঙ্গে শসা, বেগুন, পেঁপে, মুলা, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল শাক, মরিচ, পটল, লাউ ও করলার মতো নানা সবজি মিশ্রভাবে চাষ করা হচ্ছে। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের ফলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে এবং কৃষকের উৎপাদন ঝুঁকিও কমছে।



কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক সেচব্যবস্থা, সঠিক ছাঁটাই, সার ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই দমনে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে মিশ্র চাষে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে ফলের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখেই অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।


চারঘাট উপজেলার কৃষক জামাল হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত কয়েক বছর ধরে শুধু ধান চাষ করে অনেক কৃষকই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তারা এখন আমবাগানের সঙ্গে ধান, পেঁয়াজ, রসুন, বেগুন, সরিষা, হলুদ ও পেঁপে চাষ করছেন।


তিনি বলেন, “মিশ্র ফসল চাষে একদিকে মোট উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকছে। আমের ফলন বা গুণগত মানের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।” নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তার আট বিঘার আমবাগানে মৌসুমি ফসলের মিশ্র চাষ করে তিনি নিয়মিত বাড়তি আয় পাচ্ছেন।


পবা উপজেলার হুজরিপাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা প্রকৌশলী সরওয়ার জাহান, ২০২০ সালে নয় বিঘা জমিতে মাল্টার বাগান গড়ে তোলেন। চলতি মৌসুমে তিনি একই জমিতে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও কাঁচা মরিচ চাষ করেছেন। তিনি জানান, মরিচ বিক্রি করে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা এবং মাল্টা বিক্রি করে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করেছেন। ফুলকপি ও বাঁধাকপিও ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। ফসল কাটার পর তিনি কুমড়া ও শসার চারা রোপণের পরিকল্পনা করেছেন।


একই উপজেলার পুঠিয়াপাড়া গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক মোফাক্কার হোসেন তার তিন বিঘার ড্রাগন ফলের বাগানে ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়েছেন। তিনি বলেন, “ড্রাগন ফলের সঙ্গে সবজি চাষ করে আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি। এই পদ্ধতি আমার জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে।”


এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “মিশ্র ফসল চাষ বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদ্ধতি। এতে কৃষকরা কম সময়ে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদন করতে পারছেন। ফল ও সবজির মিশ্র চাষ মাটির উর্বরতা রক্ষা করে এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি নিশ্চিত করে।”তিনি জানান, চলতি মৌসুমে সরকারি হিসাবে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে মিশ্র পদ্ধতিতে সবজি চাষ হয়েছে এবং এই পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে।


তিনি আরও বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চলসহ রাজশাহী অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কৃষকদের বিকল্প ও লাভজনক কৃষি ব্যবস্থার দিকে যেতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। মিশ্র চাষ সেই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।”


পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এম.এ. মান্নান বলেন, “আমাদের কৃষকরা এখন অনেক বেশি সচেতন ও প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছেন। মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে আমরা কৃষকদের মিশ্র চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় কমছে এবং লাভের পরিমাণ বাড়ছে।”


সংশ্লিষ্টদের মতে, মিশ্র চাষ শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধি করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবার জন্যই এটি একটি লাভজনক, টেকসই ও ভবিষ্যতমুখী কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।