রবিবার, মে ০৩, ২০২৬
বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা

নগরজুড়ে শ্বেতশুভ্র স্নিগ্ধতায় মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সজনে ফুল

জাহিদ হাসান পলাশ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৩:৪৭ অপরাহ্ন কৃষি
জাহিদ হাসান পলাশ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
নগরজুড়ে শ্বেতশুভ্র স্নিগ্ধতায় মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে সজনে ফুল

শ্বেতশুভ্র স্নিগ্ধতায় মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে রাজশাহী মহানগরীর সজনে ফুল। ফুলের ভারে গাছের কোমল ডাল ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হচ্ছে- গাছও তার অন্তর মমতায় পাতা ঝরিয়ে গাছের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। 


বসন্তের শুরুতে সুগন্ধি, ছোট, সাদা ও হলুদাভ থোকায় ফোটা সজনে ফুল এখন শুধু গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়-এটি রাজশাহী মহানগরীর প্রায় সর্বত্রই একই ধরনের মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ভেষজ গুণসম্পন্ন, যা ভিটামিন এ, সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। নিয়মিত সেবনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, প্রদাহ কমে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সর্দি-কাশি ও রক্তচাপ কমায়।


সজনে ফুলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, সি, বি১, বি২, বি৩ এবং ই রয়েছে। আছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ। এ ছাড়াও সজনে ফুলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (কোয়েরসিটিন, ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড) এবং প্রোটিন থাকে।


যা নিয়মিত সেবনে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, ঋতু পরিবর্তনের সময় ভাইরাসঘটিত রোগ থেকে রক্ষা করে এবং ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা ঠিক রেখে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখে।


রাজশাহী অঞ্চলে চোখে পড়ে সজিনা গাছের ডালে ডালে সাদা ফুলের সমারোহ। দূর থেকে মনে হয়, যেন সাদা মেঘ ঝুল খাচ্ছে গাছের ডালে ডালে। মাঘ-ফাল্গুন মাসজুড়েই সজিনার ফুল ফোটার মৌসুম। এবার ফুলের আধিক্য দেখে কৃষকেরা বাম্পার ফলনের আশায় বুক বাঁধছেন। সরেজমিনে রাজশাহী মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ গাছে এতো বেশি ফুল ফুটেছে যে পাতাই প্রায় দেখা যাচ্ছে না। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ফুলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।


রাজশাহী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ৩২১ হেক্টর জমিতে সজিনার আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে ৩,৭৫৫ মেট্রিক টন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২০১ হেক্টর জমিতে আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে ২,২৫৪ মেট্রিক টন। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, রাজশাহীর মাটি ও আবহাওয়া সজিনা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে কিংবা জমির আইলে সর্বত্রই এই গাছ দেখা যায়।


পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন,“এবার গাছে ফুলের পরিমাণ অনেক বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সজিনার ডাঁটার দাম চড়া থাকে। সরবরাহ বাড়লে দাম সহনীয় হবে। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, আবার ভোক্তারাও উপকৃত হবেন।”


সজিনা, যার বৈজ্ঞানিক নাম Moringa oleifera, পুষ্টিগুণের জন্য বিশ্বজুড়ে ‘সুপার ফুড’ হিসেবে পরিচিত। রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম সোনার দেশকে বলেন,“সজিনা একটি উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য। ডাঁটা, পাতা ও ফুল-সবই খাদ্য হিসেবে ব্যবহারযোগ্য এবং প্রতিটির রয়েছে আলাদা স্বাস্থ্যগুণ।”


তিনি জানান, সজিনার ডাঁটা ভিটামিন সি, ফাইবার, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়ামে সমৃদ্ধ। এটি হজমে সহায়ক এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। সজিনা পাতায় রয়েছে ভিটামিন এ, বি-কমপ্লেক্স, সি ও ই, আয়রন, ক্যালসিয়াম ও প্রোটিন, যা রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ ও পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।


কৃষি বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে নিয়মিত সজিনা গ্রহণ পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ফুলে-ফলে ভরা গাছ তাই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, গ্রামীণ অর্থনীতি ও পারিবারিক পুষ্টির সম্ভাবনাও জাগিয়ে তুলছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে,সজনে গাছের সবটুকুই অত্যন্ত পুষ্টিকর ও ওষুধিগুনে ভরা। যে কারণে সজনেকে ‘সুপার ফুড’- হিসেবে পৃথিবীব্যাপি গন্য করা হয়। সজনে পাতায় কমলালেবুর চেয়ে ৭ গুণ বেশি ভিটামিন সি, দুধের চেয়ে ৪ গুণ বেশি ক্যালসিয়াম, কলার চেয়ে ১৫ গুণ বেশি পটাশিয়াম এবং গাজরের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ভিটামিন এ থাকে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, হজমশক্তি ও ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।