রবিবার, মে ০৩, ২০২৬

রাজশাহী অঞ্চলে এক দশকে কমেছে ৫২ শতাংশ আখচাষ

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৪ মার্চ ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ন কৃষি
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৪ মার্চ ২০২৬ ১১:১৪ অপরাহ্ন
রাজশাহী অঞ্চলে এক দশকে কমেছে ৫২ শতাংশ আখচাষ

রাজশাহী অঞ্চলে গেল এক দশকে আখচাষ কমেছে ৫২ শতাংশ। চাষিরা আখ উৎপাদন ছেড়ে অন্য ফসলে ঝুঁকছেন। জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন খরচ বেশি, নতুন করে চিনিকল গড়ে না উঠা ও ভারতীয় চিনি আমদানির কারণে আখের চাষ কমছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। 


রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ এবং চাঁপাইনাবগঞ্জ জেলা নিয়ে গঠিত কৃষি অঞ্চলে আখ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হেক্টর প্রতি ফলন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও, মোট উৎপাদনে জমির অনুপাতে হ্রাস পেয়েছে।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহী অঞ্চলের তথ্যনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই অঞ্চলে ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে আখ চাষ করা হয়েছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসছে ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ কোটি ৮০ লাখের টনেরও বেশি আখ উৎপাদন হয়েছিল। জমির পরিমাণ প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ১১ লাখ টনে নেমে এসেছে।


ভবিষ্যতে রাজশাহী অঞ্চলে আখচাষ টিকবে কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। কৃষকরা বলছেন, কম লাভ, চিনিকল থেকে বিলম্বিত অর্থ পরিশোধ ও উৎপাদন খরচের কারণে তারা আখচাষে আগ্রহী না। রাজশাহী অঞ্চলে কিছু চাষি এখনো আখচাষ করছেন। আগে চরে বিপুল পরিমাণ জমিতে আখচাষ হতো। সুগার মিলগুলো আখ মাড়াই বন্ধ করলে কৃষকরা আখচাষ কমিয়ে দেন। 


পবা উপজেলার আখচাষি আহাদ আলী বলেন, আগে আমরা উৎসাহ নিয়ে আখচাষ করতাম। এখন ঠিক তার উল্টো হয়েছে। চিনিকলে আখ সরবরাহ করলেও তা বছরের পর বছর টাকা পরিশোধ করে না। এজন্য অপেক্ষা করতে হয়। আবার ঋণ নিয়ে চাষ করতে হয়। সার ও শ্রমের দাম বৃদ্ধিতে আরও ক্ষতি হচ্ছে আমাদের।


কারণ আহাদ আলী উল্লেখ করেন, ১২ থেকে ১৪ মাস লাগে আখচাষ করতে। এজন্য স্বল্পমেয়াদী চাষে ঝুঁকতে হচ্ছে। ধান, শাকসবজি বা ভুট্টার মতো স্বল্পমেয়াদী ফসল চাষে লাভ বেশি হচ্ছে। 


আঞ্চলিক সরবরাহের উপর নির্ভরশীল দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা আছে রাজশাহী অঞ্চলে। এর মধ্যে রাজশাহী চিনিকল ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেড। রাজশাহী চিনিকলর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৌসুমে ২০ হাজার টন চিনি বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা আছে। চিনিকলে গেল বছরের ২৯ নভেম্বর থেকে মাড়াই শুরু করে এবং ৬৭ দিনের মধ্যে ৭৫ হাজার টন আখ মাড়াই হয়েছে। এতে ৬ হাজার ৯৩০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তুমাত্র ৪৪ দিন মিলটি চলে ৩ হাজার ১৭২ টন চিনি উৎপাদন করা হয়েছে। 


নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলসে বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১৫ হাজার টন। ১৩ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ টন চিনি উৎপাদন করা হয়েছে।


২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৩০ জুন নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রাজশাহী চিনিকল। দেখা গেছে, প্রায় ৭০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। যার মোট লোকসান ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকারও বেশি। নর্থবেঙ্গল সুগার মিলসও একই অর্থবছরে প্রায় ৬৬ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে।  যার মোট লোকসান প্রায় ৯৮৬ কোটি টাকা।


রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির বলেন, এক কেজি চিনিতে উৎপাদন খরচ ৩০০ টাকা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত বিক্রয় মূল্যে ১২৫ টাকা। এই ব্যবধান পূরণ করতে এবং কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি ভর্তুকির উপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হয়। 


আখচাষের এই পতন অস্থায়ী নয় বরং কাঠামোগত বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এএনকে নোমান। তিনি বলেন, আবাদ কমে যাওয়ার পেছনে আরও গভীর সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে হলোÑ পুরনো মিল প্রযুক্তি, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বিলম্বিত চাষিদের অর্থ প্রদান এবং নীতিগত অসঙ্গতি। এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর না করা হলে কৃষকরা আখের দিকে ফিরে আসবেন না।


তিনি আরও বলেন, চাষিদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য মিলগুলো আধুনিকীকরণ, চাষে যান্ত্রিকীকরণ এবং নির্ভরযোগ্য মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে।