হরমুজ প্রণালি ‘মুক্ত করতে’ ট্রাম্পের চাওয়া সহায়তায় জাপান-অস্ট্রেলিয়ার ‘না’
হরমুজ প্রণালি ইরানের দখলমুক্ত করতে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহে এখন পর্যন্ত কারও কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
কিছু কিছু দেশের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে ট্রাম্প প্রশাসন জানালেও জাপান ও অস্ট্রেলিয়া বলে দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ওই জলপথ পাহারা দিতে জাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনাই তাদের নেই।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানো যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। গত কিছুদিন ধরে পতনের ধারায় রয়েছে এশিয়ার শেয়ার বাজারগুলোও।
“আশা করছি চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও অন্যরা, (ইরানের) কৃত্রিম বাধায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত তারা ওই এলাকায় জাহাজ পাঠাবে যেন হরমুজ প্রণালি আর এমন কোন দেশের হুমকির শিকার হবে না, যাদের মাথা পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা হয়েছে,” রোববার ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প এমনটাই লেখেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।
একইদিন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসিকে বলেছেন, ট্রাম্পের বলা দেশগুলোর কারও কারও সঙ্গে তার ‘আলোচনা চলছে’ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে চীন ‘গঠনমূলক অংশীদারের’ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা করছেন।
তবে ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এখন পর্যন্ত কাউকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত চীন দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংগিউ বলেছেন, স্থিতিশীল ও বাধাহীন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতে সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
“উত্তেজনা কমিয়ে আনতে চীন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করবে,” বলেছেন তিনি।
এদিকে রোববারই ট্রাম্প বলেছেন, চীন তাকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সহায়তা না করলে তিনি এ মাসের শেষদিকে নির্ধারিত চীন সফর পিছিয়ে দিতে পারেন।
নেটো সদস্যরা ওয়াশিংটনকে সহায়তায় এগিয়ে না এলে তাদের ‘খুব খারাপ ভবিষ্যতের’ মুখোমুখি হতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ‘বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের অবসান ঘটাতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার’ গুরুত্ব নিয়ে ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে আলাদা আলাদা করে কথা বলেছেন, জানিয়েছে আল জাজিরা।
ট্রাম্প বলছেন, তার প্রশাসন এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ পাঠানো নিয়ে ৭টি দেশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে কার কার সঙ্গে তার কথা হয়েছে তা খোলাসা করেননি তিনি।
সোমবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মধ্যপ্রাচ্যে নৌযান পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তার দেশের নেই।
জাপানের যে পরিমাণ তেল কেনে, তার ৯৫ শতাংশই ওই অঞ্চল থেকে যায়, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
“জাপান স্বতন্ত্রভাবে কী করতে পারে এবং আইনি পরিকাঠামোর মধ্যেই কী কী করা যায়, জাপান তা খতিয়ে দেখছে,” পার্লামেন্টে এমনটাই বলেছেন কট্টর ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচিত তাকাইচি।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র অস্ট্রেলিয়াও বলেছে, হরমুজ খুলতে সহায়তার অংশ হিসেবে তারা কোনো নৌযান পাঠাবে না।
“আমরা জানি এটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এমন কিছু করতে আমাদের অনুরোধও করা হয়নি, কিংবা আমরা করবোও না,” অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের মন্ত্রিসভার সদস্য ক্যাথেরিন কিং।
ফ্রান্স এর আগে বলেছিল, তারা হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে চাওয়া জাহাজকে পাহারা দিতে একটি সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মিশন নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু সেটিও হবে সুবিধাজনক সময়ে, যখন যুদ্ধের তীব্রতা কমবে।
জার্মানির পররাষ্ট্র বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ইয়োহান ভাদেফুল বলেছেন, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ‘সন্দিহান’।
“আমরা কী শিগগিরই এই সংঘাতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হতে যাচ্ছি? না,” এআরডি টেলিভিশনকে এমনটাই বলেছেন তিনি।
ইরান যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসেও হরমুজ প্রণালি কার্যত ইরানের দখলেই রয়ে গেছে। তাদের অনুমতি ছাড়া ওই জলসীমা দিয়ে কোনো জাহাজ বা ট্যাংকার পার হতে পারছে না।
এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। যুদ্ধের কারণে এখন সেটি পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা হাজারের বেশি জাহাজ আশপাশে আটকা পড়ে আছে বলে জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বের অর্থনীতিতে, তেলের দাম ধীরগতিতে বাড়লেও যে কোনো সময় তা লাফ মারতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছে।
এসবই ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
তেহরান বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ছাড়া বাকিদের জন্য হরমুজ খোলা রেখেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি মার্কিন টেলিভিশন সিবিএসকে বলেছেন, অনেক দেশই তাদের নৌযানকে নিরাপদে হরমুজ পাড়ি দিতে সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছে।
“এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার আমাদের সেনাবাহিনীর হাতে,” বলেছেন তিনি।
নয়া দিল্লি ও তেহরানের মধ্যে আলোচনার পর শনিবার ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি ট্যাংকার প্রণালিটি পার হওয়ার সুযোগ পায় বলে ফিনান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত অন্তত ১০টি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা হয়েছে বলে খবর পাওয়া কথা জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস, আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন সংস্থা (আইএমও) এবং ইরাক ও ইরানের কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ‘যুদ্ধে ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে’ বলে ট্রাম্প যে বড়াই করছেন তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি মোহাম্মদ নাইনি।
“ট্রাম্প না বললেন ইরানের নৌবাহিনী ধ্বংস হয়ে গেছে? তাই যদি হয়, তিনি তার জাহাজই পারস্য উপসাগরে পাঠিয়ে দেখান, সাহস থাকলে,” নাইনি এমনটাই বলেছেন বলে জানিয়েছে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম।
তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ