শুক্রবার, মে ০১, ২০২৬

হাঁসের খামার দিয়েই স্বাবলম্বী ফরমাজুল

নাটোর প্রতিনিধি ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৮ অপরাহ্ন কৃষি
নাটোর প্রতিনিধি ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৮ অপরাহ্ন
হাঁসের খামার দিয়েই স্বাবলম্বী ফরমাজুল

একটা সময় অভাব-অনটনের সংসারে খেয়ে না খেয়ে দিন চলত, ভ্যান চালক বাবার ছয় সদস্যের অভাবের সংসারে। তার উপর ছেলে গ্রাজুয়েশন শেষ করে, বিসিএস পরীক্ষার বাড়তি খরচ। এ যেন মরার উপর খারর ঘা । এসব কিছু ব্যয় বাবার উপার্জনের একমাত্র পথ ছিলো পায়ে চালিত ভ্যান। 


আর্থিক সংকটের কারণে নিজের পড়া-লেখার খরচ চালাতে বছরের পর বছর ছেলে ফরমানকেও ভ্যান চালাতে হয়েছে। এতে তিনি দমে যাননি, আবার দুয়ারে দুয়ারে চাকরির জন্য হাতও পাতেন নি। 


পাঁচবার বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো করতে না পারায় বেকারত্বের অভিশাপ ঘোচাতে হাঁস পালনে সাফল্য অর্জন করে আত্মনির্ভরশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, ফরমাজুল ইসলাম। সে নলডাঙ্গায় ‘ফরমান হাঁসের খামার’ হিসাবে পরিচিত। 


এখন তিনি ভ্যান চালক থেকে সফল উদ্যোক্তা,হয়েছেন এক বছরের মাথায় ৯শ থেকে ৯ হাজার হাঁসের খামার মালিক।


অল্প পুঁজিতে এই ব্যবসায় সফল হওয়ায় অনেকের হয়েছে কর্মসংস্থানও। এতে নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনই আশপাশের মানুষদের দিচ্ছেন পরামর্শ। তাই দিন দিন এলাকাবাসীর হাঁস পালনে আগ্রহ বাড়ছে। শুধু ফরমান নয়,নাটোরের হালতিবিল ও চলনবিল এলাকায় প্রায় ছোট-বড় ৫হাজার হাঁসের খামার রয়েছে। 


গত দুইদিন নাটোরের  চলনবিল ও বিলহালতি, বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে জানা যায়, এসব এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫০টি হাঁসের খামার রয়েছে। এসব খামারে পাচ লাখের বেশি হাঁস পালন করা হচ্ছে। এসব খামারে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে অনেক বেকারের। নলডাঙ্গার বিলহালতি, খোলাবাড়িয়া, সিংড়ার পুঠিমারী, সেরকোল, ধুলাউড়ি, গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, উজান থেকে নেমে আসা বারনই, গদাই এবং আত্রই নদীতে হাঁসের মিছিল। আর নদীর আশপাশের বাড়িতে এদের খামার। খামারে দুই ধরনের হাঁস পালন করা হয়। ডিম দেয় এমন একটি জাত, আরেকটি হলো, মাংসের জন্য। এসব ডিম ও হাঁস  স্থানীয় ভাবে চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীতে বিক্রি করা হয়। এ এলাকার সবচেয়ে বেশি হাঁস পালন করেন, নলডাঙ্গা  উপজেলার পূর্ব সোনাপাতিল গ্রামের ফরমাজুল ইসলাম।  বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলে ৯ হাজারের বেশী  হাঁস রয়েছে। 


স্থানীয় খামারি ও আড়ৎদারদের অভিযোগ, তারা বলছেন, ডিমের আড়ৎ না থাকায় অসুবিধা হয়, তাতে জনগণকে বেশী দামে ডিম কিনতে করতে হয়। নাটোর বা নলডাঙ্গায়  ডিমের আড়ৎ থাকলে সবার জন্যই ভালো হতো। 


সিংড়ার পুঠিমারী গ্রামের খামার মালিক সুলতান বলেন, বর্তমানে খাদ্যের দাম হিসাবে ডিমের দাম কম ৮-৯শ টাকা দরে বিক্রয় হচ্ছে। নদীতে পানি না থাকায় প্রাকৃতিক  খাবার নেই। কিনা খাবারের তুলনায় হাজার-বারো টাকা শ  দরে বিক্রয় হলে ভালো হয়।


জানা যায়, জেলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র ও প্রকৃতির আধার, যা ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত। বিশাল এই বিলে বর্ষাকালে উত্তাল ঢেউ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেখা মিরে। সেই বিলের মাঝ খানে হালতি গ্রামের কাউসার ও কামালের পরিত্যক্ত তিন বিঘা ডোবা-খাল বছর ভিত্তিক ৫৪ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে হাঁসের খামার শুরু, নলডাঙ্গা উপজেলার সোনাপাতিল গ্রামের ফরমান। তার বাবা  সামান্য ভ্যান চালক । চার ভাই-বোনের মধ্যে  ফরমান সবার বড়।  


পথমে বাড়ির আঙিনায় ছোট পরিসরে দুজন মিলে দুই লাখ টাকার হাঁস দিয়ে খামার শুরু করে। হাঁসের ঘড় না থাকায় টানা বৃষ্টিতে খামারে রোগ দেখা দেয় ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে না পেরে প্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়।


শ্রমিকরা বলছেন, তারা খামারে কাজ করে যে টাকা উপার্জন করে তা দিয়ে ভালো ভাবে সংসার চলে। খামার উদ্যেক্তা ফরমাজুল ইসলাম ফরমান বলেন, ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনা ছোটকাল থেকেই ছিল তার। 


গ্রাজুয়েশন শেষ করার পরে বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নিতে থাকেন এর পাশাপাশি আর্থিক সংকটের কারণে রাজশাহীর এক মাদ্রাসায় হিসাবরক্ষক পদে চাকরি করে পাঁচবার বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরে ভালো করতে না পারায় ব্যবসা করার পরিকল্পনা করতে থাকেন । 


চাকরি ক্ষেত্রে একটা বিশ্বস্ততা ও পরিচিতি থাকায় এবং তিনি একজন হিসাববিজ্ঞানের (কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ড) ছাত্র হিসাবে মাথার মধ্যে কাজ করছিল যে, কিভাবে অন্যের টাকা ফাইন্যান্সিং করে সেটা দিয়ে ব্যবসা করা যায়? 


সেই চিন্তা থেকে ভাবতে ভাবতে মনের মধ্যে ফোকাসটা নিরাপদ এবং ন্যাচারাল খাদ্যের প্রতি। সে ক্ষেত্রে যদি ন্যাচারালি কোন কিছু উৎপাদন ভিত্তিক ব্যবসা তৈরি করা যায়, তাহলে জন্য অন্যের কাছ থেকে ফাইনান্সিং করতে সুবিধা হবে। 


তাদের যে বড় বিলটা এই বিলে শুধুমাত্র একটাই ফসল হয় এবং সারা বছর প্রায় পড়ে থাকে, সেক্ষেত্রে এই বিলটাকে কোনভাবে কাজে লাগানো যায়? এই দুই চিন্তার সমন্বয়ে মাথায় বুদ্ধি আসলো হাঁসের খামার করার। 


অবশেষে নিজের দুই লক্ষ টাকা দিয়ে এবং ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ৯০০ বড় হাঁস দিয়ে খামার শুরু। 


পরে ফেসবুকের মাধ্যমে এই খামারের প্রচার এবং বন্ধু, কলিক্স এদের কাছে ব্যবসার কথাটা প্রচার এবং শেয়ারে বিজনেস করার ঘোষণা  দেন। তাতে অনেকেই সাড়া দেয়া শুরু করল এবং প্রথম বছরেই প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করতে পারলেন। 


চলতি বছরে এসে আরো প্রায় ২০ লক্ষ টাকা অর্থাৎ সর্বমোট ৩৫ লক্ষ টাকা এখন আমার ফার্মের ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল। 


প্রথম বছরে কিছু লিমিটেশান হল-১)  খামার বিষয়ে অভিজ্ঞ-দক্ষ জনবল ছিল না । ২) খামারের আবাসন ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল না। ৩) হাঁসের শরীরের জন্য কোন ধরনের খাবার উপযুক্ত এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। এসব কারণে খামারে গত বছর প্রায় ছয় থেকে সাত লক্ষ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হন। 


পরে পরিকল্পিত ব্রুডিং (তাপ দেওয়া), উন্নত জাতের (খাকি ক্যাম্পবেল) বাচ্চা নির্বাচন এবং সঠিক খাবারের মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে থাকেন। বর্তমানে “ফরমান হাঁসের খামারে” ২০জন  শেয়ারে পয়ত্রিশ লক্ষ টাকা পুজি দিয়ে হালতিবিলে এই খামার পরিচালনা করছে। প্রতিদিন শুধু তাদের ডিম হচ্ছে, আঠারো শ-দুই হাজার। যার বাজার মূল্য বিশ হাজার টাকা। এছাড়া এই  অংশিদারি প্রতিষ্ঠানে জিরো থেকে ব্রুডিং করা ও এক-দুইটা ভ্যাকসিন করা বাচ্চাসহ সব রকমের হাঁস সরবারাহ করা হয়। এর বাইরে হাঁসের ডিম ও  ডিম থেকে হ্যাসারিতে বাচ্চা ফুটানো হয়ে থাকে।   


জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সেলিম উদ্দিন বলেন, এখানে ২৫০টির বেশী হাঁসের খামারে হাঁস পালন করে অনেকেই লাভবান হয়েছেন। জেলার নলডাঙ্গা, সিংড়া এবং গুরুদাসপুর এসব এলাকায় সারা বছর নদী ও জলাশয় কমবেশী পানি থাকায় প্রাকৃতিক খাবারের যথেষ্ট জোগান রয়েছে। এসব খামারে দুই ধরনের হাঁস পালন করা হয়। ডিম দেয় এমন একটি জাত, আরেকটি হলো, মাংসের জন্য। এসব ডিম ও হাঁস  স্থানীয় ভাবে চাহিদা মিটিয়ে রাজধানীতে বিক্রি করা হয়।