রাবিতে সদ্য সাবেক উপাচার্যের সময়ে শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়ে ‘বিতর্ক’
নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীবের সময়ে। শিক্ষক সংকট নিরসনে এই সময়ে ৩৪টি বিভাগে মোট ১৫৪ জন নতুন শিক্ষক নিয়োগ পেয়েছেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের অ্যাকাডেমিক অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও নিয়োগে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও চলছে বিতর্ক।
নতুন উপাচার্য, শাখা ছাত্রদল সভাপতিসহ অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের প্রাধান্য দিয়ে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়েছে। এর আগে, নিয়োগ চলাকালীন স্বজনপ্রীতিসহ আরও কিছু অভিযোগ তুলেছিলেন চাকরিপ্রত্যাশি কেউ কেউ। বিভিন্ন সময় নিয়োগ বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও অনশনের ঘটনাও ঘটেছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সভাপতিরা এই অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। বিভাগীয় প্রধানদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং মেধার ভিত্তিতেই যোগ্য প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। অ্যাকাডেমিক মান বজায় রাখতে কোনো প্রকার আপস করা হয়নি বলেও তারা দাবি করেন।
রাবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলামের একটি বক্তব্য সামনে আসার পর নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা ঠিক যে ভিসি ড. সালেহ্ হাসান নকীব গত ১৮ মাস ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে ভয়ের পরিবেশ জিইয়ে রেখে নিজের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছেন।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিভাগে যে দুই শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে তাদের ৯০ ভাগই বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের একটি দলের সক্রিয় ব্যক্তি। মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক নিয়োগ থেকে চতুর্থ শ্রেণির শতাধিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে একটি রাজনৈতিক দলের লোকদের। কেউ প্রতিবাদ করলে ভিসি চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিৎ।’
রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করা এক পোস্টে লিখেছেন, ‘সাবেক ভিসি নকীব স্যারের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান হয় যে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবে হয়েছে। তার সময়কালে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এমনকি বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি।’
বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, রাবির সদ্য সবেক ভিসি তার সময়ে মব পরিস্থিতি জিইয়ে রেখে ক্যাম্পাস শাসন করেছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রে করেছেন অনিয়ম। বিশেষ মহলের নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তার অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ যাতে কথা বলতে না পারে সেজন্য রাকসুর বিতর্কিত জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার ও তার সহযোগীদের দিয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছেন। জামায়াতঘনিষ্ঠ প্রো-ভিসি অধ্যাপক মাঈন উদ্দীনকে দিয়ে অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে নিয়োগ করেছেন বিশেষ গোষ্ঠীর লোকজনকে।
এদিকে শিক্ষক নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করছেন বিভাগগুলোর সভাপতিরা। শিক্ষক নিয়োগ কেমন হয়েছে জানতে কথা হয় অর্থনীতি বিভাগের সভাপতি ড. এ এন কে নোমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে অত্যন্ত উচ্চ মানের, অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। অত্যন্ত মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এখানে অস্বচ্ছতার কোনো সুযোগ নেই। নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা নিয়ে নিয়োগের আগে বা পরে কেউ আমার কাছে অভিযোগ করেনি।
নিয়োগে অস্বচ্ছতার সুযোগ নেই জানিয়ে ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এম আল বাকী বরকতুল্লাহ বলেন, আমার বিভাগে যারা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে তারা প্রত্যেকে বিভাগে ফার্স্ট, সেকেন্ড অথবা থার্ড ছিল। নিয়োগ হয়েছে অত্যন্ত স্বচ্ছ। লিখিত পরীক্ষায় যারা ভালো করেছিল তাদের ভাইভা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অস্বচ্ছতার সুযোগ নেই।
শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত ভালো শিক্ষক পেয়েছেন দাবি করে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. দিল-আরা হোসাইন বলেন, দীর্ঘ ১২/১৩ বছর পর আমার বিভাগে নিয়োগ হয়েছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যারা এ বিভাগে শিক্ষক হয়েছে তারা প্রত্যেকেই যোগ্য। তারা প্রত্যেকেই ছাত্র হিসেবেও অত্যন্ত ভালো ছিল এবং তাদের নিয়োগে আমাদের শিক্ষার্থী এবং আমরা সবাই সন্তুষ্ট। তারা ইতোমধ্যে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে এবং আমি শিক্ষার্থীদের থেকে ফিডব্যাক নিচ্ছি, সবাই ভালো প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।
নিয়োগের স্বচ্ছতার ব্যাপারে তিনি বলেন, কিছু নীতিমালা পরিবর্তন করে এ নিয়োগটা দেওয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যারা নিয়োগ পরীক্ষা দিচ্ছে তাদের যদি যেকোনো বিষয়ের ওপর সাধারণ জ্ঞান ভালো থাকে তাহলে সে বের হয়ে আসবে। লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভায় যারা ভালো করবে তারাই নিয়োগ পাবে। কয়েকটি ধাপের মাধ্যমে এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সুতরাং এখানে স্বজনপ্রীতির কতটা সুযোগ থাকে আমার আসলে জানা নেই এবং এই নিয়োগ প্রক্রিয়াতে কোনো প্রকার অস্বচ্ছতার অভিযোগ আমি পাইনি।
সার্বিক বিষয়ে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, বলা হচ্ছে ৯০ ভাগ একটি বিশেষ দলের। অ্যাবসোলিউটলি রাবিশ। যারা অহর্নিশ এই মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছে তাদের দায়িত্ব এই ৯০ ভাগের নাম পরিচয় প্রকাশ করা। না পারলে, লজ্জিত হওয়া। যদি লজ্জা থাকে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি, জামাত, এবং এনসিপি, প্রত্যেক দল থেকে শত শত তদবির এসেছে। সবচেয়ে বেশি এসেছে বিএনপির তরফ থেকে, তারপর জামাত। একটি তদবিরও আমলে নিই নি। না পাওয়ার বেদনা এবং পাত্তা না পাওয়ার কারনে, যাদের কষ্ট, সেটা আমি বুঝি। প্রমান হাজির করুন, আমার জানা দরকার। আমার জানায় একটি ক্ষেত্রেও জেনে বুঝে একজনকেও অন্তত আমি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রোমোট করিনি।
এর আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের মেয়ে ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তদন্ত শেষে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২০ সালের ১০ ও ১৩ ডিসেম্বর পৃথক ১২টি নোটিশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে সবধরনের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এরপর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সমুন্নত রাখার স্বার্থে ২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর জারি করা নিয়োগ স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও নীতিমালা অনুসরণ করে সুষ্ঠুভাবে সব নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো চালু করা হয় লিখিত পরীক্ষা।
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি
বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ভাইভা বোর্ডের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ শিক্ষক নিয়োগ। এরপর একে একে ৩৪টি বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয় ১৫৪ জন শিক্ষককে। এর মধ্যে ইতিহাস বিভাগে ৭ জন, ইংরেজি বিভাগে ৬ জন, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ৩ জন, উর্দু বিভাগে ৩ জন, আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে ৬ জন, গণিত বিভাগে ৪ জন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ৭ জন, রসায়ন বিভাগে ৪ জন, ফলিত গণিত বিভাগে ৪ জন, শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে ৭ জন, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগে ৮ জন, সমাজকর্ম বিভাগে ৮ জন, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে ৫ জন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ৪ জন।
এছাড়া ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে ৮ জন, ফলিত রসায়ন ও রসায়ন প্রকৌশল বিভাগে ৩ জন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ২ জন, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিনিউকেশন ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে ৪ জন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইন্জিনিয়ারিং বিভাগে ৪ জন, ব্যাংকিং অ্যন্ড ইন্সুইরেন্স বিভাগে ৫ জন, অর্থনীতি বিভাগে ৩ জন, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগে ৬ জন, নাট্যকলা বিভাগে ৩ জন, ইনস্টিটিউট অব ইংলিশ অ্যন্ড আদার ল্যাঙ্গুয়েজেজ বিভাগে ৩ জন,
পপুলেশন সায়েন্স অ্যন্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগে ৩ জন, মনোবিজ্ঞান বিভাগে ২ জন, আরবী বিভাগে ৮ জন, পরিসংখ্যান বিভাগে ৪ জন, ফাইন্যান্স বিভাগে ৪ জন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনলোজি বিভাগে ৪ জন, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগে ১ জন, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে ৫ জন, সংগীত বিভাগে ২ জন, চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগে ৪ জন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমন্বয়কদের সুপারিশে ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব। তার বাবা প্রয়াত অধ্যাপক মহিউদ্দিন ছিলেন রাবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।