বর্ষবরণে প্রস্তুত রাজশাহী
বর্ষবরণের এবারের প্রতিপাদ্য ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার’। সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়াই এই প্রতিপাদ্যের মূল লক্ষ্য। আর এই নববর্ষ বরণ করতে প্রস্তুত হচ্ছে রাজশাহী। বৈশাখী শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। লক্ষ্য পহেলা বৈশাখকে রঙিন করা। পুরনোকে পেছনে ফেলে নতুনকে স্বাগত জানানো।
নববর্ষকে সামনে রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রস্তুতিতে ব্যস্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। বৈশাখী শোভাযাত্রা উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন নানা বর্ণিল মোটিফ, যেখানে বাঙালির ঐতিহ্যের পাশাপাশি উঠে আসছে সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
এবারের শোভাযাত্রায় যুদ্ধ ও জ্বালানিসংকটের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। চারুকলা অনুষদের শিক্ষক এ কে এম আরিফুল ইসলাম জানান, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিতে এমন মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে মানুষ আবার পুরনো বাহনের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হতে পারে,এমন বার্তা রয়েছে। তিনি বলেন, ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ি সেই বাস্তবতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
শোভাযাত্রার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ির মোটিফ, যা শক্তি, গতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি জাতীয় মাছ ইলিশ, শৈশবের স্মৃতিবাহী টমটম গাড়ি এবং প্রাচীন রাজা-বাদশা ও ঐতিহাসিক চরিত্রের মুখোশ স্থান পাচ্ছে আয়োজনে। বিশ্ব পরিস্থিতি তুলে ধরতে একটি বিশেষ ইনস্টলেশন আর্ট প্রদর্শনেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন একাডেমিক ভবনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বাঁশ, লোহা ও কাগজ দিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করে বিভিন্ন মোটিফ তৈরি করছেন। রংতুলির ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে সেগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে।
মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী নাসির বলেন, গত বছর রমজানের কারণে বড় পরিসরে আয়োজন সম্ভব হয়নি। তবে এবার নতুন উদ্যমে কাজ করছি। শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ পাচ্ছি। আরেক শিক্ষার্থী জানান, নিজেদের হাতে সব কিছু তৈরি করার মধ্যে ভিন্নধর্মী আনন্দ রয়েছে এবং তারা শোভাযাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করতে কাজ করছেন।
অর্থায়ন প্রসঙ্গে চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শ্রম ও অর্থায়নেই প্রস্তুতি চলছে। সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখতে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্পন্সর নেওয়া হয়নি।
এদিকে, কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারিত প্রতিপাদ্য না থাকায় এবং বিতর্ক এড়াতে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বৈশাখী শোভাযাত্রা নামেই আয়োজন করা হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সময় ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম আনা হয়েছে এবং সন্ধ্যার মধ্যেই কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও নববর্ষ উদ্যাপন ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
আয়োজকদের আশা, রাজশাহীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শোভাযাত্রা উপভোগ করতে আসবেন। শোভাযাত্রার পাশাপাশি থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের মতে, এ ধরনের সর্বজনীন উৎসব গ্রামাঞ্চলে আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে, যা মানবিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এবার পহেলা বৈশাখ মাতাবে রাজশাহীর সুশান্ত কুমার পালের ঐতিহ্যবাহী ‘শখের হাঁড়ি’। বৈশাখ বরণে মাটির তৈরি হাঁড়িসহ ছোট বাচ্চাদের মাটির খেলনা তৈরির অন্যতম কারিগর হলেন রাজশাহীর পবা উপজেলার বসন্তপুরের মৃৎশিল্পী সুশান্ত কুমার পাল। পহেলা বৈশাখের মুখে পালের বাড়ি এখন মাটির তৈরি হাঁড়ি, হাতি, ঘোড়া, হরিণ, পুতুলসহ নানা পণ্যে ঠাসা। কোনোটি এখনও নরম কাদায় মাখানো, আবার কোনোটি রোদে শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। কোনোটিতে রঙতুলির আঁচড় দেওয়া হচ্ছে।
মাটির তৈরি বিভিন্ন আকারের হাঁড়িতে শৈল্পিক কারুকার্য দেখে মন ছুঁয়ে যাবে যে কারও। প্রতিবছর বৈশাখে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিপুল চাহিদা থাকে এই শখের হাঁড়ির। আসন্ন বৈশাখী মেলাকে ঘিরে বসন্তপুর গ্রামে শখের হাঁড়িসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারুশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়েছে। দিনরাত সমানতালে কাজ করছেন তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পালপাড়ায় ৭০ বছর বয়সী সুশান্ত কুমার এবং তার দুই ছেলে মাটির তৈরি নানান জিনিসপত্র তৈরি করছেন। এসব জিনিসপত্র বিক্রি করে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের তৈরি পণ্যের বেশির ভাগই গৃহস্থালি ও সাংসারিক সাজসজ্জার উপকরণ। মূলত দেশের বিভিন্ন মেলা উপলক্ষে তারা মাটি দিয়ে হাঁড়ি, ঘোড়া, কচ্ছপ, ছোট-বড় পুতুল, মাছ, সিংহ, হাতি, কবুতর, পেঁচা, বাঘ ইত্যাদি তৈরি করে বিক্রি করেন। ফলে বৈশাখী মেলাকে ঘিরে তাদের ব্যস্ততা বেড়েছে।
কারিগররা জানান, বৈশাখ এলেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গার মানুষ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এতে কাজের চাপ বেড়ে যায়। তবে বৈশাখ শেষ হলে আর কোনো বিশেষ চাহিদা থাকে না।
শখের হাঁড়ির কারিগর মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল জানান, বৈশাখী মেলার আয়োজনে তাদের ব্যস্ত থাকতে হয়। সারা দেশ থেকে ক্রেতারা আসেন শখের হাঁড়ি কিনতে। চার পিসের শখের হাঁড়ি, ছোট পাতিল, সাজি, পঞ্চ সাজি, মাটির পুতুল ও খেলনা ক্রেতারা নিয়ে যান।
কারিগর আনন্দ কুমার পাল বলেন, অনেক আগে থেকেই শখের হাঁড়ি দেখছি। আগে অনেক পরিবারই এই কাজ করত। এখন কারিগরের সংখ্যা কমছে। শৌখিন মানুষের কাছে শখের হাঁড়ির চাহিদা আছে, তবে আগের মতো নেই। দেশের সুনামধন্য কারিগর সুশান্ত কুমার পাল জায়গা করে নিয়েছেন চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে। সেখানে তার ছবিসহ গল্প রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পদক ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন পুরস্কার। তিনি ঘুরে বেড়েছেন জাপান, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল।