বৈশাখীতে রঙের ছোঁয়ায় রাঙাবে বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গন
নববর্ষের আগমনে কবিগুরু রবিঠাকুরের ‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/ তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।/ মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ কবিতার কথাগুলো হৃদয়ে ধারণ করে উত্তরের জনপদ বগুড়ার প্রকৃতিতে বৈশাখের আগমনী গান শুরু হয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আর মাত্র একদিন পরেই বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ।
এই উৎসবকে ঘিরে বগুড়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গন ও স্কুল-কলেজ, বিশেষ করে বগুড়া আর্ট কলেজে শুরু হয়েছে উৎসবের কর্মযজ্ঞ। দিন-রাত চলছে তুলির আঁচড় আর মাটির সরায় রঙের খেলা। কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে কুমার পল্লীতেও। এর মধ্যে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া ও শাহজাহানপুর উপজেলায় নববর্ষ উপলক্ষে বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা ব্যস্ত সময় পার করছে। নারী, পুরুষ, শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সি মৃৎশিল্পের কারিগররা এখন মহাব্যস্ত।
বৈশাখ ১৪৩৩ সামনের রেখে অতিতের সকল দু:খ গ্লানি ধুয়ে মুছে শান্তিরবার্তা বাঙালি জাতির মনে আনন্দের বন্যায় জাগ্রত করে তোলে। নববর্ষের উৎসবকে ঘিরে উপজেলাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে বসবে বর্ষবরণ মেলা। সেই মেলায় বিভিন্ন রকমের মাটির খেলনাসহ বিভিন্ন জিনিসের চাহিদা থাকে। তাই এখন শেষ মুহুর্তে দিন রাত ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা ছিল।
নববর্ষ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন উপজেলারগুলোর বিভিন্ন স্থানে বসে বর্ষবরণ মেলা। সেই মেলায় চাহিদা থাকে নানা রকমের খেলনা, মাটির জিনিসপত্রের। তাই মৃৎশিল্পীরা নিজের হাতে নিপুণ কারুকাজে মাটি দিয়ে তৈরি করেন শিশুদের জন্য রকমারি পুতুল, ফুলদানি, রকমারি ফল, হাঁড়ি, কড়াই, ব্যাংক, বাসন, থালা, বাটি, হাতি, ঘোড়া, কলস, ঘটি, চুলা ও ফুলের টবসহ বিভিন্ন মাটির জিনিসপত্র।
শুধু আর্টস, কুমোর বা সংস্কৃতিগুলোই ব্যস্ত নয়, নব আনন্দের নববর্ষের বৈশাখী বর্ণিল রঙের ছোঁয়ায় নিজেকে রাঙাতে ব্যস্ত রয়েছে নানা পেশাজীবিরাও। তাদের মধ্যে গ্রাম-বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম উপকরণ ঢোল-ঢাক ও খোল , স্বরাজ বা দোতারা, একতারা, খঞ্জনি। এসবের ব্যবহারকারী বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী ঠিকঠাক করে নিচ্ছে যন্ত্রের সুকতলা ও তার। খাঁটি বাঙালি সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছে পোশাক তৈরী ও বিক্রেতা। নববর্ষকে সাদরে বরণকালে নিজেকে রঙিন সাজে উপস্থাপন করতে দেয়া হচ্ছে অনলাইনে পোশাকের অর্ডার। এদিকে স্থানীয় শিল্লী ও কলাকুশলীরা নিজেদের গান পরিবেশন, আবৃতি উপস্থাপনে নিতে ব্যস্ত নানা ধরণের রিহার্সেল।
এদিকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বগুড়া সাংস্কৃতিক ফোরামসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয়গুলোতে এখন নিয়মিত চলছে গান, নাচ, নাটিকা, কবিতা আবৃত্তির মহড়া। এসো হে বৈশাখ গানের সুরে মুখরিত হচ্ছে প্রতিটি সংগঠন কার্যালয়। রচনা প্রতিযোগিতা ও লোকজ সংগীতের আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত জেলা, উপজেলা প্রশাসন ও শিল্পকলা একডেমি।
অবশ্য এবার নববর্ষকে বরণ উৎসব আরো জমকালো করতে বর্তমান সরকারের দলের অঙ্গ সংগঠন জাসাস কে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচী একীভূত করা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শুধু জেলা সদরই নয় নববর্ষকে সাদরে বরণ করতে ব্যস্ত সময় পারছে উপজেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সংগঠন। বর্ণিল ও নান্দনিকতায় নজর কাঁড়তে কোন কোন সংগঠন গোপনে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদিকে সম্প্রতি সরেজমিনে বগুড়া আর্ট কলেজ গিয়ে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুপর্ণা, হাসান, চঞ্চল, তুলনা, সৌমিক, মেহেদীসহ আরও অনেকের মধ্যে কেউ করছেন রঙের কাজ, কেউ করছেন মাটির কাজ, কেউ করছেন কাগজ কেটে বিভিন্ন নক্শা করে তাতে রং করছেন, কেউ বাঁশ চট দিয়ে তৈরি করছেন বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ঘোড়ার কাজ, আবার কেউ কাজে ব্যস্ত আছে শীতল পাটি ও বাঁশ দিয়ে বিশালাকৃতির বিশাল আকৃতির ইলিশ মাছের অবয়ব। লোকজ মুখোশ, কেউ ব্যস্ত শখের হাড়ি বা সরাচিত্রের অলঙ্করণে। লোকজ মোটিফের মাধ্যমে বাঙালির আদি ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তোলাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
কলেজের শিক্ষার্থীদের তৈরি এই শিল্পকর্মগুলোই শোভা পাবে বৈশাখী শোভাযাত্রায়। এ ব্যাপারে কলেজের গ্রাফিক ডিজাইনের প্রভাষক মো: রবিউল ইসলাম বলেন, বৈশাখী উৎসব বাঙালীর প্রাণের উৎসব। বাংলা ১৪৩৩ সালকে বরণ করে নিতে বগুড়া আর্ট কলেজ প্রতি বছরের মত কাজ করছে। এর মাধ্যমে নতুন বছরে আমরা বাঙালীর ইতিহাস, অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই।
শুধু আর্ট কলেজই নয়, নববর্ষ ১৪৩৩ কে বরণ করতে প্রাইভেটভাবে গড়া ওঠা আটর্স একাডেমীগুলোর প্রশিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা রঙ তুলির ছোঁয়ার নানা অবয়বে নকশা, মুখোশ ও নানা শিল্পকর্ম বানাচ্ছেন।
বর্ষবরণ অনুষঙ্গ তৈরীর কাজে ব্যস্ত শেরপুরের চিত্রশিল্পী চন্দন কুমার বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ। প্রতি বছরই আমরা দিনরাত পরিশ্রম করি শুধুমাত্র সাদরে বর্ষবরণ অনুভূতির স্বাদের ভিন্নতা পেতে।
শেরপুর শেরউড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের আর্ট শিক্ষক এনামুল হক মাসুদ বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের খাঁটি বাঙালিয়ানায় পরিণত করে। নতুন বছর আগমন উপলক্ষে গ্রামীন লোকজ সংস্কৃতির ঐহিত্য হৃদয়ে ধারণ করতেই নিজে ও শিক্ষার্থীদের নানা শিল্পকর্মে উৎসাহিত করে আসছি। এর মাধ্যমে শুধু সংস্কৃতিই রক্ষা হবেনা, রক্ষা পাবে আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
শেরপুরের নৃত্যাঞ্জলী আর্টস একাডেমী পরিচালক নৃত্যগুরু কেএম কামরুল হাসান পাশা বলেন, আবহমান গ্রাম বাংলার সুপ্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বর্তমান প্রজন্মদের উৎসাহিত করতে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিকগনসহ সংস্কৃতিকর্মীদের আন্তরিকতার প্রয়োজন। তাহলেই নববর্ষের পহেলা বৈশাখ বাঙালির পরিচয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও চেতনার প্রকাশ হয়ে অধুনালব্ধ সমাজকে রক্ষা করবে।
বগুড়ার জেলা সদরে বৈশাখী মেলার আয়োজক বগুড়া সাংস্কৃতিক ফোরামের সদস্য সচিব এড. পলাশ খন্দকার জানান, বৈশাখী মেলা আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। এবছর এ মেলার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা লোকজ যত ব্যাপার আছে এবং আমাদের জীবন থেকে যেসব গ্রামীন ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে তা তুলে ধরা হবে।
এই জন্য মেলা মঞ্চে প্রতিদিন লাঠিখেলা, সাপখেলা,বায়োস্কোসহ বিলুপ্তপ্রায় লোকজ খেলাধূলার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও চারু-কারু পণ্যের প্রদর্শণ ও বিক্রি ছাড়াও নাগরদোলনা, মাটির পুতুল, বেত ও বাঁশশিল্পের সাথে পরিচিত হবে সবাই।
বৈশাখী উৎসবের সবচেয়ে বড় মেল বন্ধনের জায়গা হলো বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী ৪৫তম বৈশাখী মেলা। বগুড়া পৌর পার্কের শহীদ টিটুমিলনায়তন চত্বরে বগুড়া সাংস্কৃতিক ফোরাম ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে এবং জেলা প্রশাসন, বগুড়া পুলিশ প্রশাসন, বগুড়া পৌরসভার সার্বিক সহযোগিতায় বৈশাখী মেলার ১৩৩ তম আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
১৪ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচদিন এই মেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চে প্রতিদিনই দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, লাঠিখেলা, সাপখেলা,বায়োস্কোসহ বিলুপ্তপ্রায় লোকজ খেলাধুলা, চারু-কারু পণ্যের প্রদর্শণ ও বিক্রি ছাড়াও নাগরদোলনা, মাটির পুতুল, বেত ও বাঁশশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসবেন কারিগররা।
জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, বাংলা নববর্ষের পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের সংস্কৃতির শেকড় “আমাদের এ শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত যেসব উপাদান রয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস-ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার ও বর্তমান সময়ে তা সংরক্ষণ করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”
বাংলা নববর্ষকে ঘিরে রঙের প্রলেপ আর ঢাকের কাঠির শব্দের প্রতীক্ষায় খাঁটি বাঙালিয়ানার স্বাদ নিতে চায় জেলাবাসী। তাইতো জেলাজুড়ে আয়োজন করা হবে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরিবেশিত হবে পান্তা-ইলিশ ও পিঠাসহ ঐতিহ্যবাহী খাবার। জারি-সারি, ভাটিয়ালি ও বাউল গানের সুরে মুখর থাকবে জেলার গ্রাম থেকে শহর সবখানেই ছড়িয়ে পড়বে উৎসবের আনন্দ।