সোমবার, এপ্রিল ২০, ২০২৬

ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে বাধ্য, অবৈধ সরিষা মিলে কিশোরের হাত হারানো-দায় কার?

শাহীন সাগর, মোহনপুর ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৩ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শাহীন সাগর, মোহনপুর ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৩ অপরাহ্ন
ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে বাধ্য, অবৈধ সরিষা মিলে কিশোরের হাত হারানো-দায় কার?

রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলায় একটি অবৈধ সরিষার তেল মিলে কাজ করতে গিয়ে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মিল মালিকের গাফিলতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারির অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


ভুক্তভোগী কিশোর জাহিদুর রহমান জিহাদের (১৪) বাড়ি উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের হরিফলা গ্রামে। তার বাবা মো. বুলবুল আহমেদ জানান, তারা অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার। প্রায় এক বছর ধরে জিহাদ মৌগাছি বাজারের জানবক্স ট্রেডার্স নামের একটি মুদি দোকানে কাজ করত।


অভিযোগ রয়েছে, দোকানটির মালিক মো. মুরাদুল ইসলাম দেড় বছর আগে কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়াই দোকানের পাশেই ‘মুরাদ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি সরিষা ভাঙানো মিল স্থাপন করেন। জীর্ণশীর্ণ পরিবেশে গড়ে ওঠা এই মিলেই জিহাদকে বিভিন্ন সময় কাজ করতে বাধ্য করা হতো।


জিহাদের পরিবারের দাবি, গত ১৬ মার্চ সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে মিলের মেশিনে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তার ডান হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে গুরুতর অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিন দিন চিকিৎসা শেষে বর্তমানে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে সে।


পরিবারের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অদক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ভয়ভীতি ও মারধরের আশঙ্কা দেখিয়ে জিহাদকে কাজে পাঠানো হতো। এর আগেও একই মিলে এক শ্রমিকের আঙুল কাটা পড়ার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট সরিষা মিলটির কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। তবুও দীর্ঘদিন ধরে তা চালু থাকলেও বিষয়টি নজরে আসেনি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কিংবা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় কর্মকর্তাদের।


স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি থাকলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। শ্রম আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিককে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও এখানে তা প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করা হয়েছে।


অভিযোগের বিষয়ে মিল মালিক মো. মুরাদুল ইসলাম বলেন, “জিহাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা আমি করেছি। স্থানীয়ভাবে মীমাংসার সময় ক্ষতিপূরণ দাবি করা হলেও আমি তা দিতে রাজি নই।”


এদিকে, আইনি প্রতিকার চেয়ে জিহাদের বাবা মোহনপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। 


এবিষয়ে থানা ওসি মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, ভুক্তভোগীর দাবি ছিল জিহাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা মিল মালিককে বলে আমরা তার চিকিৎসা নিশ্চিত করেছি।


রাজশাহী কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) মো. সাখাওয়াত আলম বলেন, “ঘটনাটি আমার জানা নেই। আমি বর্তমানে প্রশিক্ষণে আছি। ফিরে এসে বিষয়টি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।”


একই দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কেউ আইন ভঙ্গ করে কলকারখানা স্থাপন বা শ্রম অধিকার লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


সচেতন মহল মনে করছে, অবৈধ কারখানার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা বাড়তে পারে।


ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে। দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।