চোখ যখন গন্ধ পায়, কানে জাগে স্বাদ! মস্তিষ্কের এমন আশ্চর্য অবস্থাটি কী করে হয়?
“মালতী, তোমার মন নদীর স্রোতের মত চঞ্চল উদ্দাম ; মালতী, সেখানে আমি আমার স্বাক্ষর রাখিলাম।” তিরিশের দশকের কবি অজিত দত্তের লেখা এই পঙ্ক্তিগুলি এক সময় বাঙালি যুবাদের মুখে মুখে ফিরেছে। কবিতা তার নিজের জায়গায় সপ্রযুক্ত উপমাই ব্যবহার করেছে। চঞ্চল মনের সঙ্গে নদীতরঙ্গের উপমা খুব সুদূর নয়। কিন্তু সেখানে ‘সাক্ষর’ রাখা? বাস্তবে কোথাও সাক্ষর করতে গেলে কালি-কলম লাগে। নদীর উদ্দাম জলস্রোতে তা কি রাখা যায়? কবির কল্পনায় হয়তো যায়। কিন্তু বাস্তবে যদি কেউ জলকে সাদা কাগজের পাতা ভাবেন আর তার উপরে নীল বা কালো রঙের কালি দিয়ে সই করার কথা কল্পনা করেন, তবে তাঁকে কিঞ্চিৎ ছিটগ্রস্ত সাব্যস্ত করতেই পারে সমাজ। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, তেমনটা হতেই পারে। তবে তার জন্য দরকার মস্তিষ্ক তথা স্নায়ুতন্ত্রের বিশেষ অবস্থা।
আবার, রেডিয়োয় শোনা একটা গানের কলি, ঠাকুমার তোরঙ্গের গন্ধ ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে স্বপ্নময় স্মৃতিতে। স্রেফ গন্ধ শুঁকে পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যাওয়া, নিছক কল্পনা নয়, বরং বিজ্ঞান এ শক্তিকে যথাযথ বলেছে। মিঠে রোদে গা ভাসিয়ে— এ কথা তো অনেকেই বলেন। তা রোদের স্বাদ কি কেউ চেখে দেখেছেন? সুকুমার রায়ের ‘সীতানাথ বন্দ্যো’ মনে হয় চেখেছিলেন। না হলে বললেন কী ভাবে ‘আকাশের গায়ে নাকি টকটক গন্ধ’ বলতে পারেন? বৃষ্টি হলে তা না কিআবার এক্কেবারে মিষ্টি হয়ে যায়! ধরাছোঁয়ার বাইরে যা কিছু, তাকে রং, শব্দ বা আকারে কল্পনা করা এক ধরনের প্রবৃত্তি। তা সকলের থাকে না। কারও কারও থাকে। তাই কবির কল্পনায় স্বপ্নের রং নীল, মেঘের ছায়ার স্বাদ পানসে। কিন্তু বাস্তবেই কারও কারও ইন্দ্রিয়গুলি যেন উল্টেপাল্টে যায়। বা মিলেমিশে যায়। তখন সুরও চোখে দেখা যায়! শোনা যায় রং! ইন্দ্রিয়ের এই অতি-সক্রিয়তার নাম ‘সিনেস্থেসিয়া’। তবে তা বিশ্বে ০.২ শতাংশ বা তারও কম জনের হয়।
ইন্দ্রিয়ের জগাখিচুড়ি
মানুষের তো পাঁচটি ইন্দ্রিয়। চোখ দিয়ে দেখা, কান দিয়ে শোনা, জিভ দিয়ে স্বাদ গ্রহণ, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেওয়া আর ত্বক দিয়ে স্পর্শ অনুভব করা। এই তো কাজ। প্রতি ইন্দ্রিয় যে যার নির্দিষ্ট পথে চলে। এখন ভাবুন তো, বৃষ্টির শব্দ শুনলে মনে নানা রং খেলা করে কি না? কখনও গান শুনতে শুনতে চোখের সামনে নানা অবয়ব-রং কল্পনা করেন কি? অনেকে বলবেন, তা মাঝেমধ্যে হয়। যাঁদের প্রতি ক্ষণে হয়, তাঁরাই ‘সিনেস্থেট’। সিনেস্থেসিয়া কোনও রোগ নয়। সিনড্রোমও নয়। এক অতি বিরল স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে এক ইন্দ্রিয় সাড়া দিলে, অন্যটিও স্বয়ংক্রিয় ভাবে জেগে ওঠে। সিনেস্থেটরা (এই ক্ষমতা যাঁদের আছে) তাঁরা বেশ কল্পনাপ্রবণ। হয়তো ধ্বনি শুনলে রং দেখতে পান, অথবা শব্দ শুনে তার স্বাদ বুঝতে পারেন। অক্ষর বা সংখ্যার নির্দিষ্ট রং অনুভব করতে পারেন, অথবা স্বাদ পেলে কোনও জ্যামিতিক আকার দেখতে পান।
আমির খসরু গেয়েছিলেন, ‘‘আপনি সি রং দিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে?’’ এক পলক তাকিয়েই কী ভাবে তুমি তোমার রঙে রাঙিয়ে তুলতে পারো আমায়— নয়নে নয়ন মিললেই যেন লজ্জার লাল রং লাগে গালে। অনুভূতিরও রং হয়। তা সিনেস্থেট দেখতে পান। গন্ধকে পাকড়াও করে ফিরে যেতে পারেন স্মৃতিতে। খুব মলিন হয়ে যাওয়া স্মৃতিও স্রেফ গন্ধের জোরে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে পারে তাঁদের সামনে। সবই স্নায়ুর কারসাজি। গবেষকেরা একে ব্যাখ্যা করেন ‘ক্রস-অ্যাক্টিভেশন থিয়োরি’ দিয়ে। যখন ইন্দ্রিয়ের অনুভূতিগুলি একে অপরের উপর চেপে বসে বা বলা ভাল ইন্দ্রিয়ের সমাপতন হয়। কান যখন শব্দ শোনে, তখন চোখ তার রং কল্পনা করে, আবার চোখ যখন কোনও দৃশ্য দেখে জিভ তার স্বাদ অনুসপ্ক
হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’, কেমনে তা জনি না
ছিল হাঁস, ছিল সজারুও। ব্যাকরণ না মেনেই তারা মিলে গিয়ে হল ‘হাঁসজারু’। কবির কল্পনায় হাঁসের সঙ্গে সজারুর মিলে যেতে পারে, আবার বকের সঙ্গে কচ্ছপ মিলে বকচ্ছপও হতে পারে। তবে সবটাই মজার ছলে। কিন্তু বাস্তবের সিনেস্থেটরা স্বতঃস্ফূর্থ ভাবে কল্পনাতেই এমন নির্মাণ করে চলে চলেন। সিনেস্থেসিয়া অসংখ্য রকমের হতে পারে। তবে কয়েকটি পরিচিত বিষয় কিছু মানুষের আছে। তাই সেগুলিই আলোচনায় উঠে এসেছে বারে বারে। গ্রাফিম-কালার সিনেস্থেসিয়ার এক ধরন। এতে অক্ষর বা সংখ্যা দেখলেই মনে মনে নির্দিষ্ট কোনও রং দেখা যায়। সিনেস্থেটরা ইংরেজি বর্ণমালার ‘এ’ অক্ষরটিতে অনেক সময়েই লাল রং হিসাবে কল্পনা করে নেন। তেমনই সুরের প্রতি স্বরকে আলাদা আলাদা রঙে চেনেন কেউ কেউ। এই রং-কল্পনা একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফিনম্যান তাঁর প্রতিটি গাণিতিক সমীকরণকে নানা রঙে কল্পনা করতেন। প্রতি সংখ্যা, অক্ষরকে আলাদা আলাদা রঙে চিনতেন। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় ‘উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা’ বা ‘চিনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাস’-এর কথা লিখেছেন। তাঁর সিনেস্থেসিয়া ছিল কি না জানা যায় না। তবে এমন অদ্ভুত উপমা যদি কেউ বাস্তবে বোধ করেন, তিনি অবশ্যই সিনেস্থেট।
ক্রোমেস্থেসিয়ায় গান বা শব্দ শুনলে চোখের সামনে কোনও আকার বা জ্যামিতিক নকশা ভেসে ওঠে। বলা হয়, চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের ক্রোমেস্থেসিয়া ছিল। তিনি পিয়ানোর সুরকে রঙের সঙ্গে মেলাতেন। ইন্দ্রিয়ের একই রকম অতিসক্রিয়তা রয়েছে পপ গায়িকা লেডি গাগারও। তাঁর সুরে রঙের প্রভাব বড় বেশি। গাগা নিজেই নানা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সুর ভাবার সময়ে তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে নানা রং। তাঁর ‘ক্রোমাটিকা’ অ্যালবামটি সুর ও রঙের মিলমিশের জন্যই জনপ্রিয়। গায়িকা বিলি আইলিশের নিজের তো বটেই, তাঁর পরিবারের অনেকেরও সিনেস্থেসিয়া আছে। বিলি তাঁর গানের প্রতি সুরকে নির্দিষ্ট রং ও দৃশ্যের সঙ্গে কল্পনা করেন।
লেক্সিক্যাল গাস্টেস্টোরি সিনেস্থেসিয়ার আরও একটি ধরন। এখানে শব্দের সঙ্গে স্বাদের মিলমিশ ঘটে। কোনও শব্দ শুনলে তার স্বাদ অনুভব করা যায়। ব্রিটিশ লেখক জেমস ওয়ানারটন সিনেস্থেসিয়ার এই ধরনের জন্যই পরিচিত। তাঁকে নিয়ে এক সময়ে লেখালেখিও হয়েছে বিস্তর। জেমস জানিয়েছেন, তিনি শব্দের স্বাদ অনুভব করতে পারেন।
স্পেশাল সিকোয়েন্স সিনেস্থেসিয়া যাঁদের থাকে, তাঁরা দিন-মাস বা বছরগুলিকে একটি নির্দিষ্ট আকারে ত্রিমাত্রিক অবস্থানে কল্পনা করেন। সপ্তাহের কোনও দিন বা কোনও তারিখ চোখের সামনে একটি মানচিত্রের মতো ভেসে ওঠে। তাঁরা মনে করেন, তাঁদের চারদিকে এমন এক অদৃশ্য বলয় আছে, যেখানে ঘড়ির কাঁটা, ক্যালেন্ডারের দিন বা নানা সংখ্যার ক্রমগুলি পর পর সাজানো আছে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানে। কেউ তা স্বচক্ষে দেখতে পান, আবার কেউ শুধু অনুভব করেন।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন