মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৮, ২০২৬
একনেকে অনুমোদন

পশ্চিমাঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ সংস্কারে ২০২৮ কোটি টাকার প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩২ অপরাহ্ন জাতীয়
নিজস্ব প্রতিবেদক ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩২ অপরাহ্ন
পশ্চিমাঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথ সংস্কারে ২০২৮ কোটি টাকার প্রকল্প

গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ৯৪৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু এ অঞ্চলের অর্ধশত বছরের পুরোনো রেলপথগুলো রক্ষণাবেক্ষণে দেওয়া হয়নি প্রয়োজনীয় বরাদ্দ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেলপথগুলোর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয়প্রাপ্ত, দিন যতই গড়াচ্ছে ক্ষয়ের পরিমাণও বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।


রোববার সচিবালয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (১ম পর্যায়) প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। 


পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে যার পুরো অর্থ জোগান দেবে সরকার। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০৩১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। পাঁচ বছরমেয়াদি এই প্রকল্পটির আওতায় জয়দেবপুর-ইব্রাহিমাবাদ, সয়দাবাদ-ঈশ্বরদী বাইপাস, ভেড়ামারা-ঈশ্বরদী বাইপাস, ঈশ্বরদী-সৈয়দপুর, সান্তাহার-জয়পুরহাট, বিরামপুর-পার্বতীপুর, আবদুলপুর-রাজশাহী কোর্ট এবং ভবানীপুর-মধ্যপাড়ার অংশ পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হবে। রেল পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এবং ভবানীপুর থেকে মিটারগেজ ও মেইন লাইনের (এমজিএমসিএল) ২১ দশমিক ৪৯২ কিলোমিটার পর্যন্ত রেলপথ পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে।


পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকল্পটি নিয়ে যাচাইবাছাই কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে কিছু সিদ্ধান্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।


প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ভবানীপুর থেকে এমজিএমসিএলের ২১ দশমিক ৪৯২ কিলোমিটার রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ পুনর্বাসন করা হবে। এছাড়া নৈমিত্তিক সংস্কার ৫০০ কিলোমিটার এবং সম্পূর্ণ ৪৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার ট্র্যাক সংস্কার করা হবে। 


ব্যয় বিভাজনে দেখা গেছে, রেললাইন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা যা মোট প্রকল্পের ব্যয়ের ৪৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। রেললাইনের স্লিপার ও ফিটিংসের কাজে ব্যয় হবে ৬৬২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা যা মোট প্রকল্পের ব্যয়ের ৩৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এছাড়া রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণের সরঞ্জাম, টামপিং মেশিন (লাইনের নিচে শক্ত পাথর বসানোর যন্ত্র), মিটার গেজ এবং রেলওয়ে কর্মীদের চলাচল বা সরঞ্জাম বহনের ছোট যানে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা যা মোট প্রকল্পের ব্যয়ের ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। প্রকল্পটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটে জিওবি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য অননুমোদিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


রেলপথ মন্ত্রণলায়ের দেওয়া তথ্য মতে, পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন সেকশনগুলোয় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ স্লিপার ক্ষতিগ্রস্ত বা অচল হয়ে রয়েছে। একই সঙ্গে পাথরের ঘাটতি ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে যা রেললাইনের ভারসাম্য, গেজ এবং সমান্তরালতা বজায় রাখতে সমস্যা সৃষ্টি করছে। ফাটল, ভাঙা রেল এবং ঘন ঘন ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে।


পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম বলেন, প্রকল্পটি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে পরিষেবার মান উন্নয়ন করবে। প্রকল্পটি মার্চ ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০৩১ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। এতে জয়দেবপুর-ইব্রাহিমাবাদ, সয়দাবাদ-ঈশ্বরদী বাইপাস, ভেড়ামারা-ঈশ্বরদী বাইপাস, ঈশ্বরদী-সৈয়দপুর এবং আবদুলপুর-রাজশাহী কোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় প্রকল্পটিকে জরুরি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ রেললাইন প্রায় একশো বছর পুরোনো এবং ইতোমধ্যে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে যা ক্রমাগত বাড়ছে। ঘন ঘন রেল ভাঙন, দুর্বল সংযোগ এবং কাঠামোগত অবনতি নিরাপদ ট্রেন চলাচলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।


রেলওয়ের কর্মকর্তারা আরও জানান, সেকশনভিত্তিক সক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত ট্রেন চলাচলের ফলে রেল, স্লিপার ও ফিটিংস দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। ফলে অনেক এলাকায় ট্রেন নিয়ন্ত্রিত গতিতে চলাচল করছে যা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবায় প্রভাব ফেলছে। জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৭১ হাজার ৫২৫ কোটির বেশি ব্যয়ে আটটি নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্যমান


রুটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ ছিল না। বছরে যেখানে ১৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন সেখানে বরাদ্দ কম ছিল। চলতি অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাত্র ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


কর্মকর্তারা বলেছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বিভিন্ন অংশে ট্রেন চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সময়ে সরকার ট্রান্স-এশীয় রেল নেটওয়ার্ক, বিমসটেক এবং বিবিআইএন উদ্যোগের আওতায় আঞ্চলিক রেল সংযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে যা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য পশ্চিমাঞ্চলের রেল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করবে।


প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন অংশের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে রেল পরিচালনার সক্ষমতা ও যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি পাবে।