বুধবার, মে ০৬, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে যেভাবে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলেছে বিজেপি

সোনার দেশ ডেস্ক ০৬ মে ২০২৬ ১২:৫০ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৬ মে ২০২৬ ১২:৫০ অপরাহ্ন
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে যেভাবে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলেছে বিজেপি
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পর গেরুয়া শিবিরের আনন্দ মিছিল। ছবি: এএফপি

পশ্চিমবঙ্গে চলতি বছরের নির্বাচন কেবল তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনাবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি–বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের ইতিহাস হিসেবে মনে থাকবে না। বরং এটি এমন এক মুহূর্ত, যখন বহুদিনের সীমান্ত প্রশ্ন নতুন করে নির্বাচনী মোদ্দা হিসেবে গতি পেয়েছে এবং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানে বাংলাদেশকে কেন্দ্রীয় জায়গায় নিয়ে এসেছে। এই নির্বাচনে অনেকগুলো মেজর ফ্যাক্টর বা নির্ণায়ক ইস্যুর মধ্যে বাংলাদেশ কেন্দ্রিক বয়ানও অন্যতম।

রায় স্পষ্ট। ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) তথ্য বলছে, ২৯৪ আসনের বিধানসভার ২৯৩টি আসনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। ঘোষিত ফল অনুযায়ী, এই ২৯৩ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি, আর তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। ফল্টা কেন্দ্রের ভোট পুনর্গণনার কারণে এখনও ফল প্রকাশ হয়নি।

বিজেপির এই বিশাল জয় একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তৃণমূলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে এন্টি–ইনকামবেন্সি বা শাসনবিরোধী মনোভাব, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মতো নানা ইস্যু। অন্যদিকে বিজেপির ছিল শক্তিশালী সংগঠন ও প্রচারযন্ত্র। এই বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে আদর্শিক সংহতি দিয়েছে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর।’ এটি অসন্তোষকে রূপ দিয়েছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত নিরাপত্তা সংক্রান্ত চিন্তাধারায়।

বাংলাদেশ এখানে এক আয়নার মতো কাজ করেছে। আর এই আয়নার মাধ্যমে বিজেপি নিজস্ব বয়ানে পশ্চিমবঙ্গকে নিজেকেই দেখতে আহ্বান জানিয়েছে। তাদের এখানে স্পষ্টত পক্ষ বেছে নিতে বলা হয়েছে—হিন্দু না মুসলিম, শরণার্থী না অনুপ্রবেশকারী, সীমান্তবাসী না জাতির অংশ, বাঙালি না দেশবিরোধীর মতো অবস্থানগুলো থেকে। এটিই বিজেপির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য। তারা বাংলাদেশকে এমন এক বয়ানে পরিণত করেছে, যার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে নাগরিকত্ব, জনসংখ্যা, কল্যাণ এবং আনুগত্যকে পাঠ করা হয়।

এটি সম্ভব হয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার অপসারণ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যাওয়ার কারণে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বৈধতা, সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলার সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, গণবিক্ষোভে হাসিনাকে পদত্যাগ ও দেশত্যাগে বাধ্য করার পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের দোকান, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে।

এ বছরও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশে গণপিটুনি এবং কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর চাপের কথা জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গে ছড়ানো প্রতিটি তথ্য কতটা সঠিক ছিল, তা নির্বাচনী দৃষ্টিকোণে ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; বরং গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই রাজনৈতিক ধারণা, যা তৈরি করা হয়েছে বিজেপির প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে। আর এই ধারণার কারণে অনেক হিন্দু ভোটারের মধ্যে পূর্ব সীমান্তকে এক ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সীমারেখা হিসেবে দেখেছে।

বিজেপির প্রচারণা এই বাংলাদেশকেন্দ্রিক বয়ান তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তর করেছে। প্রথমত, দলটি নিজেকে বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দু শরণার্থীদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছে, বিশেষ করে সিটিজেন অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) মাধ্যমে। এই আইন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা (হিন্দু অন্য ধর্মের) শরণার্থীদের জন্য ভারতীয় নাগরিকত্বের দ্রুত পথ তৈরি করে। তবে সেই সুযোগ মুসলিমদের জন্য নয়। এই আইনের বিধি ২০২৪ সালের মার্চে জারি হয় এবং প্রথম নাগরিকত্ব সনদ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের মে মাসে।

দ্বিতীয়ত, বিজেপি তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসনকে’ তৃণমূলের তথাকথিত ‘ভোটব্যাংক’ রাজনীতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে। বিজেপির দাবি এবং প্রচার, এই অবৈধ অভিবাসী তথাকথিতরা ‘বাংলাদেশি’ এবং মুসলিম। আর মমতা মুসলিম তোষণের রাজনীতি করেন।

তৃতীয়ত, এই দুই বিষয়কে তারা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে। তারা ইঙ্গিত দেয়, শুধু বিজেপি সরকারই কলকাতাকে নয়াদিল্লির সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিষয়ে সমন্বয় করাতে পারবে। এই কৌশলের সাফল্য এবং বিপদ—দুটোই ছিল। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের কাছে এটি স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি, আর বাঙালি মুসলিমদের দিকে ছুড়ে দেয় সন্দেহের তীর। এবং ফলাফল বলছে, বিজেপি তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে, তারা সফল।

এই দ্বিমুখী বার্তার কেন্দ্রে ছিল মতুয়া প্রশ্ন। মতুয়ারা পূর্ববঙ্গ (দেশভাগের আগে বাংলাদেশের যে নাম ছিল) এবং পরে বাংলাদেশের দলিত শরণার্থী সম্প্রদায়। তারা শুধু একটি জাতিগত গোষ্ঠী নয়—তারা ১৯৪৭ সালের জটিল ইতিহাসের প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে তারা ভুগেছে জাতিগত প্রান্তিকতা, বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চিত নাগরিকত্ব, নথিগত অনিশ্চয়তা এবং কল্যাণ ও রাজনৈতিক স্বীকৃতির অসম প্রাপ্তির বোঝা নিয়ে।

নির্বাচনী প্রচারণায় তৃণমূল কল্যাণমূলক উদ্যোগ ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মতুয়াদের কাছে টানার চেষ্টা করে। বিজেপি দেয় আরও গভীর এক প্রস্তাব—নাগরিকত্বকে ঐতিহাসিক অবিচারের সংশোধন হিসেবে তুলে ধরে। এই কারণেই ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শুধু প্রশাসনিক কাজ ছিল না। বিজেপি এটিকে ‘কারা প্রকৃত নাগরিক’—তার গণভোট হিসেবে উপস্থাপন করে।

প্রায় ২৭ লাখ মানুষ তাদের নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। সমালোচকদের মতে, এই প্রক্রিয়া বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি এটিকে গণতান্ত্রিক শুদ্ধিকরণ হিসেবে তুলে ধরে। এখানে ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ শুধু বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি পরিণত হয়েছে অবকাঠামোয়। সীমান্ত সংক্রান্ত এই বয়ান ভাষান্তরিত হয়েছে ভোটকেন্দ্রে, ভোটার তালিকায় এবং সেই উদ্বিগ্ন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা নাগরিকদের ভিড়ে—যারা হাতে নথির পুঁটলি নিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে তারা সত্যিই নাগরিক।

পশ্চিমবঙ্গে তথাকথিত লক্ষাধিক অবৈধ ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’ থাকার অভিযোগের মুখে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক সীমান্তের নিরাপত্তা কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব এবং বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স–বিএসএফ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনেই কাজ করে। মমতার এই দাবিই সঠিক। তিনি বিজেপির ভাষ্যকে সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করেন।

কিন্তু এই যুক্তিগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক। মমতার বক্তব্য অভিযোগের জবাব দিয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়া ভয় দূর করতে পারেনি। ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কল্যাণভিত্তিক জনপ্রিয়তাকে ‘বাঙালি ব্যতিক্রমবাদে’ মিশিয়ে রেখেছিল। তৃণমূলের এই বিশ্বাস ছিল যে, বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। ২০২৬ সালের ফলাফল দেখাচ্ছে, সেই ব্যতিক্রমবাদ আর কার্যকর নয়। বিজেপি শিখে গেছে কীভাবে বাংলায় হিন্দুত্বের ভাষা বলতে হয়।

বিজেপির ভোট প্রকৌশল যেভাবে ধসিয়ে দিল মমতার দুর্গবিজেপির ভোট প্রকৌশল যেভাবে ধসিয়ে দিল মমতার দুর্গ

‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ বিজেপিকে স্থানীয় সমস্যা—চাকরি, অপরাধ, দুর্নীতি, কল্যাণের অপচয়—এসবকে জাতীয় আঘাতের বৃহত্তর বয়ানের সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করেছে। এটি হিন্দু জাতির একত্রীকরণকে সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসন নয়, বরং আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের রূপ দিয়েছে। তৃণমূলকে ঠেলে দিয়েছে এক অসম্ভব অবস্থানে—যেখানে মুসলিম নাগরিকদের রক্ষা করতে গিয়ে তাদের ‘অনুপ্রবেশকারী সমর্থক’ তকমা পেতে হচ্ছে, আবার পূর্ব পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থী-অভিবাসীদের সমর্থন করতে গিয়ে ‘ভোটব্যাংক তৈরি’র অভিযোগে পড়তে হচ্ছে।

বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, দেশটিতে তথাকথিত ইসলামপন্থী সংগঠনের সক্রিয়তা এবং ভারতবিরোধী বক্তব্য—এসবকে কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একইসঙ্গে এগুলোকে ভারতীয় মুসলিমদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপনের অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করা উচিত নয়।

বাংলাদেশ সবসময়ই পশ্চিমবঙ্গের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দেশভাগ, ভাষা, অভিবাসন, নদী, শ্রম, আত্মীয়তা, স্মৃতি এবং শোকের ইতিহাসের প্রবাহে এই দুই অঞ্চল অঙ্গাঅঙ্গি জড়িত। কিন্তু এই নির্বাচনে যা বদলেছে, তা হলো রাজনৈতিক রূপ। সীমান্ত পরিণত হয়েছে নির্বাচনী অস্ত্রে। বিজেপির জয় প্রমাণ করে, ইতিহাস সবসময় অতীতে আটকে থাকে না; তাকে বর্তমানে ডেকে এনে ভোটকেন্দ্রে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করা যায়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য স্ক্রলে লিখিত সুইডেনের লিনিয়াস ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের সিনিয়র লেকচারার নীলাদ্রি চ্যাটার্জির নিবন্ধ থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা অনলাইন