শনিবার, মে ০৯, ২০২৬

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কেন রেকর্ড তাপপ্রবাহ ছড়াচ্ছে

সোনার দেশ ডেস্ক ০৮ মে ২০২৬ ০৮:৪৫ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৮ মে ২০২৬ ০৮:৪৫ অপরাহ্ন
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় কেন রেকর্ড তাপপ্রবাহ ছড়াচ্ছে

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে রেকর্ড ভাঙা ও প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে কয়েক কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম জনবহুল এ অঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।


বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলোতে তাপমাত্রা ঋতুভিত্তিক স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। কিছু কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা এরও ওপরে পৌঁছে গেছে।


গত মঙ্গলবার পাকিস্তানে তাপমাত্রাজনিত কারণে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। ভারতেও দাবদাহের কারণে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষার আগে গ্রীষ্মকালীন দাবদাহ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বিজ্ঞানীরা এবং আবহাওয়া সংস্থাগুলো বলছে, সাম্প্রতিক এই দাবদাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব এবং বিস্তৃতি নজিরবিহীন।


বিশেষজ্ঞরা ক্রমাগত এই চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার পেছনে মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করছেন। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরন বদলে যাচ্ছে এবং তা চরম রূপ নিচ্ছে।


কোন দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ ফরিদপুর, রাজশাহী ও পাবনা জেলায় গরমের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। এ সময় এসব এলাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।


বাংলাদেশে বেশ কিছুদিন ধরেই তাপমাত্রা বাড়ছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে দেশজুড়ে টানা ২৪ দিন দাবদাহ বয়ে যায়। যা গত ৭৫ বছরের মধ্যে দীর্ঘতম। এর আগে ২০১৯ সালে ২৩ দিন দাবদাহের রেকর্ড ছিল। এবার দেশের কিছু কিছু জেলায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে গেছে।


এছাড়া, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) দেশের অধিকাংশ এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, চলতি মাসে ভারতের পশ্চিমাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে তীব্র দাবদাহ বয়ে যেতে পারে। 


আইএমডির প্রধান মৃত্যুঞ্জয় মহাপাত্র জানিয়েছেন, মে মাসে পূর্ব উপকূলের রাজ্যগুলো এবং গুজরাটে চার থেকে পাঁচদিন অতিরিক্ত দাবদাহের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কিছু এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।


পাকিস্তানেও আগামী কয়েকদিন দাবদাহ চলার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর (পিএমডি) সিন্ধু প্রদেশের বাসিন্দাদের সরাসরি সূর্যের তাপ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। 


কেন আগাম দাবদাহ?

ভারতে অস্বাভাবিকভাবে আগাম ও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে বলে আলজাজিরাকে জানিয়েছেন ভারতী ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসি থিঙ্কট্যাঙ্কের গবেষণা পরিচালক অঞ্জল প্রকাশ। তিনি বলেন, উচ্চচাপ বলয় প্রাধান্য বিস্তার করছে। এতে গরম বাতাস মাটির কাছাকাছি আটকে থাকে এবং ওপরে উঠে ঠান্ডা হতে পারে না।


প্রকাশ বলেন, নিচের দিকে নামা এই বাতাস চাপের কারণে আরো উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং মেঘ তৈরি হতে বাধা দেয়। ফলে সূর্যের তাপ অবিরামভাবে জমতে থাকে। জলবায়ু-সংক্রান্ত কয়েকটি কারণও এই তাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। 


মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে, বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে এল নিনো তৈরি হয়। এ সময় আমেরিকা থেকে এশিয়ার দিকে প্রবাহিত পূর্বাঞ্চলীয় বাতাসও দুর্বল হয়ে পড়ে।


জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যেই এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।


তাপপ্রবাহে কেমন প্রভাব পড়ছে?

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিত্তল সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের’ গবেষক কার্তিকেয় ভাটোটিয়া বলছেন, প্রচণ্ড গরম আবহাওয়া মানুষের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে। তবে এই প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়।


ভাটোটিয়া বলেন, সবচেয়ে সরাসরি ক্ষতিটা হয় শারীরিকভাবে। অতিরিক্ত গরম শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক সক্ষমতাকে ভেঙে দেয়। এতে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ে, কিডনির ক্ষতি হতে পারে। এছাড়া, ঘুম ব্যাহত হয় এবং ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্ট ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়।


সমস্যার একটি বড় অংশ কাঠামোগত বলেও উল্লেখ করেন ভটোটিয়া। তাঁর ভাষায়, শ্রমজীবী মানুষদেরই বেশি সময় তীব্র গরমের মধ্যে কাজ করতে হয়। ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েন।


ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কেমন হবে?

গবেষক কার্তিকেয় ভাটোটিয়া বলছেন, জলবায়ু মডেলগুলো দেখাচ্ছে, মাঝারি মাত্রার নির্গমন পরিস্থিতিতেও আগামী কয়েক দশকে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চরম তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা- দুটিই বাড়বে।


এই গবেষক আরো বলেন, তাপমাত্রা বাড়লেই যে মানুষের ভোগান্তি একই হারে বাড়বে, এমন নয়। তবে এজন্য সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ভালো অভিযোজন পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি এবং সতর্কতার ব্যবস্থা চালু থাকলে, তাপমাত্রা বাড়লেও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।


তথ্যসূত্র: আলজাজিরা