ইরান যুদ্ধে বিলিয়ন ডলার আয় করেছে যেসব কোম্পান
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে যখন বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ বাড়তি জীবনযাত্রার খরচে চাপে পড়েছে, তখন কিছু বহুজাতিক কোম্পানি এই সংকট থেকেই বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। এর ফলে অনেক দেশের অর্থনীতি চাপে পড়লেও কিছু খাত ও কোম্পানির আয় রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
শুক্রবার (৮ মে) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে। এই অস্থিরতা থেকেই লাভ করছে ইউরোপীয় জ্বালানি জায়ান্টগুলো। ব্রিটিশ কোম্পানি ‘বিপি’ ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
একই সময়ে ‘শেল’ আয় করেছে প্রায় ৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘টোটাল-ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর মুনাফাও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে ৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি কোম্পানি ‘অ্যাক্সনমোবিল’ ও ‘শেভরন’ কিছুটা সরবরাহ সংকটে পড়লেও বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি আয় করেছে এবং বছরের বাকি সময়েও আরও বেশি মুনাফার আশা করছে।
ব্যাংকিং খাতও এই যুদ্ধ থেকে বড় ধরনের সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো শেয়ার ও বন্ড বাজারের অস্থিরতা থেকে বিপুল আয় করছে। ‘জেপি মরগান’-এর ট্রেডিং বিভাগ ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে রেকর্ড ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করেছে। পাশাপাশি ব্যাংক অব আমেরিকা, গোল্ডম্যান স্যাকস, মরগান স্ট্যানলি ও সিটিগ্রুপ সহ বড় ব্যাংকগুলোর মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ বিক্রি করে নিরাপদ বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। সেই বাড়তি লেনদেন থেকেই ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ছে।
চেয়ে প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগীদের একটি হলো প্রতিরক্ষা শিল্প। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি এবং সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কোম্পানি ‘বিএই সিস্টেমস’ জানিয়েছে, বৈশ্বিক নিরাপত্তা হুমকি বাড়ায় সরকারগুলোর সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তাদের ব্যবসার জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ঠিকাদার লকহিড মার্টিন, বোয়িং ও নর্থরোপ গ্রুম্যানও ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রেকর্ড অর্ডার পেয়েছে।
অন্যদিকে, এই যুদ্ধ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি সামনে আসায় সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘নেক্সইরা এনার্জি’-এর শেয়ারের দাম এ বছর ১৭ শতাংশ বেড়েছে। ডেনমার্কের বায়ুশক্তি কোম্পানি ‘ভিস্তাস’ ও ‘অর্স্ট্যাড’ বাড়তি মুনাফার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘অক্টোপাস এনার্জি’ জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির পর থেকে তাদের সৌর প্যানেল বিক্রি ৫০ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে পেট্রলের দাম বাড়ায় বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদাও বেড়েছে, বিশেষ করে চীনা নির্মাতারা এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে।