শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

নাটোরে ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত হলো চড়ক পূজা

নাটোর প্রতিনিধি ১৫ মে ২০২৬ ০৯:২২ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নাটোর প্রতিনিধি ১৫ মে ২০২৬ ০৯:২২ অপরাহ্ন
নাটোরে ১০ বছর পর অনুষ্ঠিত হলো চড়ক পূজা

লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন হলো চড়ক পূজা। চৈত্রসংক্রান্তিতে শিবের আরাধনাকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।


বাংলার গ্রামীণ জনপদে বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম বর্ণাঢ্য এবং রোমাঞ্চকর উৎসব হলো চড়ক পূজা। মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শিব উপাসনার অংশ হলেও, এটি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলার একটি লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর চৈত্র চৈত্রসংক্রান্তিতে এই পূজা উদযাপিত হয়। 


খোলা জায়গা উন্মুক্ত পরিবেশ না থাকায় দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে এই লোকসংস্কৃতি। হারিয়ে যাওয়া এ সংস্কৃতিকে আজও ধরে রেখেছেন নাটোর শরেরউত্তর পটুয়াপাড়া মাতা মন্দির কমিটি। 


শুক্রবার (১৫ মে) বিকালে শহরের চাইপাড়ার বাগান বাড়ি সংলগ্ন মাঠে এ চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুরদুরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শকরা পূজাটি উপভোগ করে। 


চড়ক পূজাকে কেন্দ্র করে গ্রামবাংলার বিভিন্ন স্থানে বিশাল মেলা বসে।


মাটির পুতুল, খৈ-মুড়কি, পাঁপড় ভাজা এবং নাগরদোলার শব্দে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই রোমহর্ষক দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় জমান।


আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র মন্ডল মনি জানান, চড়ক পূজার মূল প্রস্তুতি শুরু হয় মাসখানেক আগে থেকে। যারা এই পূজায় অংশ নেন, তাদের বলা হয় ‘গাজন সন্ন্যাসী’ বা ‘ভক্তা’। তারা মাসব্যাপী কঠোর নিরামিষ আহার, সংযম এবং উপবাস পালন করেন। সন্ন্যাসীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিবের গান গেয়ে চাল-ডাল ও অর্থ সংগ্রহ করেন, যাকে গ্রাম্য ভাষায় ‘মাগন’ বলা হয়।


এ পূজার মূল আকর্ষণ হলো চড়ক গাছ ও কৃচ্ছ্রসাধন চড়ক পূজার প্রধান স্তম্ভ হলো একটি লম্বা সোজা মরা গাছ, যা ‘চড়ক গাছ’ নামে পরিচিত। এই গাছটিকে পূজার আগে পুকুর থেকে তুলে আনা হয় এবং মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পূজার দিন ভক্তারা অত্যন্ত কঠিন সব শারীরিক কসরত প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, বড়শি বিঁধানো, ভক্তার পিঠে লোহার বড়শি গেঁথে তাকে চড়ক গাছের মাথায় ঝুলিয়ে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়।


ভক্তদের বিশ্বাস, এই কৃচ্ছ্রসাধন ও শারীরিক যন্ত্রণার মাধ্যমে তারা দেবাদিদেব মহাদেবের সন্তুষ্টি লাভ করেন এবং জগতের মঙ্গল বয়ে আনেন।


পিটিছি চড়ক পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং লৌকিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। যুগ যুগ ধরে এই উৎসবটি গ্রামবাংলার মানুষের মিলনমেলা হিসেবে টিকে আছে এবং আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের জানান দিচ্ছে।