সংসদ নির্বাচন আরও ভালো করার সুযোগ ছিল: আনফ্রেল
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস (আনফ্রেল) জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শতভাগ ত্রুটিমুক্ত না হলেও আরও ভালো করার সুযোগ ছিল।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় আনফ্রেল। এ সময় ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।
সংবাদ সম্মেলনে আনফ্রেলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের প্রধান রোহানা হেত্তিয়ারাচ্চি, নির্বাহী পরিচালক ব্রিজা রোজালেস এবং নির্বাচন বিশ্লেষক কার্লো আফ্রিকা উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এমএম নাসির উদ্দিন ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন আনফ্রেলের সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর থারিন্দু আভেয়রাথনা।
ব্রিজা রোজালেস বলেন, নির্বাচন কমিশন খুবই নিরপেক্ষ ছিল এবং আমরা উন্নতি দেখেছি। কিন্তু অবশ্যই আমরা আপনার উদ্বেগগুলোও নোট করছি।
আমি বলছি না নির্বাচন শতভাগ ত্রুটিমুক্ত হয়েছে। নির্বাচন আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। তারা যা করেছে, তা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, এমনকি আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও তারা যে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হোক না কেন। আমার মনে হয়, তারা প্রস্তুত। তারা এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুতরাং, নির্বাচন কমিশনের ওপর আমাদের যথেষ্ট আশা আছে।
আনফ্রেলের প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, নির্বাচনের স্থায়ী সংকট হচ্ছে জবাবদিহিতা। নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আস্থা সীমিত ছিল, বিশেষত অর্থের প্রভাব ও নির্বাচনী অর্থায়নের বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রচারের সঙ্গে উচ্চ নির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ের যোগসূত্র স্থাপন করেছেন, আর আইন প্রয়োগব্যবস্থাকে প্রায়শই অসম এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবাস্তব বলে মনে করা হয়েছে।
নাগরিক সমাজের অনুসন্ধানেও প্রার্থীদের অতিরিক্ত ব্যয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার মধ্যে কিছু ব্যয় নির্বাচনী প্রচারকাল শেষ হওয়ার আগেই সংঘটিত হয়েছে বলে মূল্যায়ন করা হয়। পোস্টার সংক্রান্ত বিধিগুলো দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও তার প্রয়োগে ছিল স্পষ্ট অসামঞ্জস্য, যা কমিশনের নিজস্ব বিধি-বিধান কার্যকর করার ক্ষমতা নিয়ে জনমনে আস্থা হ্রাস করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিনেই অর্থের প্রভাবসংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে আনফ্রেল। যা সুশৃঙ্খল ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোটদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছিল। রাজনৈতিক দলের দেওয়া ভোটার স্লিপ কিছু ভোটার ভোটকক্ষে প্রবেশের সময় পোলিং এজেন্টদের সামনে প্রদর্শন করছিলেন, যা উদ্বেগজনক ছিল।
সংস্থাটি বলছে, এটি ভোট কেনাবেচা বা প্রলোভনমূলক চুক্তির একটি যাচাইকরণ পদ্ধতি হিসেবে কাজ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে অযাচিত প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
নির্বাচনপূর্ব ও প্রচারের সময় ভয়ভীতি ও সহিংসতার পরিবেশ ছিল উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে সূক্ষ্ম চাপ প্রয়োগ ও ‘পেশিশক্তি’ ব্যবহার দেখা গিয়েছে। আনফ্রেলের পরিদর্শন করা ভোটদান ও গণনার কেন্দ্রগুলো সাধারণত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং অংশীজনদের উপস্থিতি ছিল প্রতিবেদনে বলা হয়।
তবে, গুরুত্বপূর্ণ স্বচ্ছতামূলক সুরক্ষা ব্যবস্থা সর্বত্র সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। ভোট গণনার সময়, কোনো কোনো স্থানে ব্যালট বাক্স খোলার সময় মূল যাচাইকরণ পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা হয়নি এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা একইভাবে কার্যকর ছিল না। তবে তা ভোটের ফলাফল পরিবর্তিত হয়েছে বলে প্রমাণ করে না। তবে এটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে আস্থা হ্রাস করার ঝুঁকি তৈরি করে। ভবিষ্যতে বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করে আনফ্রেল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্যপ্রবাহের পরিবেশ অত্যন্ত সক্রিয় ছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও বর্ণনাগত প্রতিযোগিতার একটি মূল ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করেছে। নাগরিক তথ্য ও বিষয়ভিত্তিক বার্তা সংক্রান্ত গণতান্ত্রিক বিষয়বস্তু সাধারণত কারসাজি, ভীতি প্রদর্শন ও বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ সংক্রান্ত অগণতান্ত্রিক বিষয়বস্তু তুলনায় বেশি ছিল। পর্যবেক্ষক পরিচয়পত্র ভোটের অল্প কিছুদিন আগে দেওয়ায় ভোটার নিবন্ধন, প্রচার ও বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সর্বজনীন অংশগ্রহণের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। আনফ্রেলের মনে করছে, বাংলাদেশে নির্বাচন দিনের আস্থার ইতিবাচক অগ্রগতি তখনই টেকসই হবে, যদি নির্বাচন-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা রূপান্তরমূলক বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে অগ্রসর হয়, যা নিয়মভিত্তিক জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নির্বাচনী অর্থ ব্যয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, অভিযোগ করার স্পষ্ট সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, ভয়ভীতি দেখানো ও বারবার রাজনৈতিক সংকট তৈরির সুযোগ বন্ধ করতে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ।
তথ্যসূত্র: বাংলানিউজ