২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট
বাস্তবায়নে সরকারের দক্ষতা ও সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে
দুই দশক পর আবারও জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি দেশের ৫৫তম জাতীয় বাজেট এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। এবং এটিই এ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ বৃহৎ বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বা বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে সরকার। বাজেটে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে বাজেট সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানান হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়া জুন মাস জুড়ে চলতেই থাকবে। চিরাচরিত চর্চা অনুযায়ী সরকারি দলের বাজেটের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হবে, বাজেটকে তারা জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব বলে কথার ফুলঝুরি ঝরাবে। অন্যদিকে, বিরোধী দল বাজেটকে গণবিরোধী ও ধনিক গোষ্ঠির স্বার্থ রক্ষাকারী বাজেট বলেই উল্লেখ করা হয়। দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা তেমনই। তারপরও রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসে, বাজেট প্রণয়ন করেÑ এভাবেই চলছে ৫৫ বছর ধরে। এমনই বাজেট অনুশীলনের মধ্য দিয়েই দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত আছে। সফলতা ও ব্যর্থতার হেরফেরও আছে। তবে এটা বলাই যায় দেশের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হয় নি- যা হওয়ার কথা ছিল।
বাজেট অবশ্যই একটি রাজনৈতিক দলিল। মূলত বাজেটের মধ্য দিয়ে জাতীয় সম্পদের বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বাজেটের মধ্যেই ক্ষমতাসীন দলগুলোর নিজস্ব ধ্যান-ধারণা ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটে। এটা দোষের কিছু নয়- পৃথিবীর সব দেশে একই ধরনের ব্যবস্থা আছে। তবে সব বাজেটেরই ঘোষণা থাকে যে, দেশ ও দেশের মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন। এখানে দেখার বিষয় যে, জাতীয় সম্পদের বণ্টন ব্যবস্থা কেমন হচ্ছে। সম্পদের কতটুকু প্রান্তিক পর্যায়ে কিংবা ধনিক শ্রেণির মানুষদেরই স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে। ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে কি না। বাজেটের অর্থনৈতিক বিন্যাস ধরেই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি হবে। এই উন্নয়নে দেশের কত শতাংশ মানুষ তাদের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি উন্নতির ক্রমধারার অংশিজন হতে না পারে- তা হলে বাজেট প্রশ্নবিদ্ধই হবে। সরকারের ব্যর্থতাকে দৃশ্যমান করে তুলবে।
বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলাই যেতে পারে। উচ্চাভিলাষ কোনো অন্যায়ও নয়। সরকারের দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করবে এই বাজেট কতটুকু সফল হবে। সরকারের জন্য সব বাজেটই চ্যালেঞ্জিং। তাদের বাজেট বাস্তবায়নে নানামুখি চাপ মোকাবিলা করতে হবে। তাই এই বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ আরো অধিক। বিপুল পরিমাণের ঘাটতি বাজেট সরকার কীভাবে সামলাবে সেটা তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। তবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চাওয়া হলো- তাদের আয়-রোজগার থাকবে, ক্রয় ক্ষমতা থাকবে, মানবিক মর্যাদা বোধের সুরক্ষা থাকবে, আইনের শাসন থাকবে। এর ব্যত্যয় হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে- হতদরিদ্রের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে।
দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য এই বাজেট যথার্থই বলা যায়- যদি সরকার বাজেটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। তেমনই প্রত্যাশা রইল।