বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬

‘ইসলামে হিজাব অপরিহার্য নয়’-এলাহাবাদ হাইকোর্ট

সোনার দেশ ডেস্ক ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৭ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৭ অপরাহ্ন
‘ইসলামে হিজাব অপরিহার্য নয়’-এলাহাবাদ হাইকোর্ট

স্কুলের পোশাকের (ইউনিফর্ম) সঙ্গে হিজাব বা মাথায় স্কার্ফ পরার অনুমতি চেয়ে করা এক মুসলিম ছাত্রীর আবেদন খারিজ করে দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, ওই ছাত্রী এটা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে যে- মাথা ঢেকে রাখা একটি অপরিহার্য ধর্মীয় প্রথা, যার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া বা ছাড় দেওয়া বাধ্যতামূলক।


বিচারপতি জে. জে. মুনির এবং বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ শুক্লার বেঞ্চ সুকাইনা রিজভির দায়ের করা আবেদনটি খারিজ করে দেয়। প্রয়াগরাজের টেগোর পাবলিক স্কুলের এক নাবালিকা ছাত্রী সুকাইনা একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় মাথায় স্কার্ফ পরে স্কুলে আসতে চেয়েছিল। আদালত জানায়, স্কুলের নির্ধারিত পোশাকবিধি (ড্রেস কোড) কার্যকর করা যেতে পারে, যদি তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে এবং কোনও বৈষম্য ছাড়াই প্রয়োগ করা হয়।


আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, কেবল ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় পছন্দের ওপর ভিত্তি করে কোনও শিক্ষার্থী নির্ধারিত পোশাকের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বা ব্যতিক্রম দাবি করতে পারে না। আদালত আরও বলে, “যতক্ষণ পর্যন্ত পোশাকবিধি সবার জন্য অভিন্ন, সৎ উদ্দেশ্যে প্রণীত, বৈষম্যহীন এবং শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি বজায় রাখার লক্ষ্যে নির্ধারিত হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম বা পোশাক নির্বাচনের বিষয়টি মূলত স্কুলের একক্তিয়ারভুক্ত।”


মামলাটি কী?

রিজভি ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত আত্তারসুইয়া-ভিত্তিক একটি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন এবং জানিয়েছেন যে, ওই বছরগুলোতে তিনি কোনও আপত্তি ছাড়াই মাথায় স্কার্ফ (হেডস্কার্ফ) পরতেন। তবে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সময় তিনি দাবি করেন যে, স্কার্ফ পরা অব্যাহত রাখলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি নিতে অনিচ্ছুক।

মায়ের মাধ্যমে রিজভি হাইকোর্টে আবেদন করেন এবং স্কুলের নির্ধারিত ইউনিফর্মের “পাশাপাশি” স্কার্ফ পরার অনুমতি চেয়ে আদালতের আদেশ প্রার্থনা করেন। ওই ছাত্রী যুক্তি দেন যে, মাথায় স্কার্ফ পরা তার ধর্মীয় অনুশীলনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি দাবি করেন, এতে বাধা দেওয়া তার সাংবিধানিক অধিকার (বিশেষ করে সংবিধানের ১৪ এবং ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের অধীনে প্রাপ্ত অধিকার) লঙ্ঘন করে।

স্কুল কর্তৃপক্ষ রিজভির এই দাবির বিরোধিতা করে। তারা জানায় যে, স্কুলের ইউনিফর্মের নিয়ম সব ছাত্রছাত্রীর জন্যই প্রযোজ্য এবং কোনও একজন ছাত্রীকে অতিরিক্ত পোশাক পরিধানের অনুমতি দেওয়া হলে তা কার্যত নির্ধারিত পোশাকবিধির (ড্রেস কোড) ক্ষেত্রে একটি ছাড় বা ব্যতিক্রম তৈরির শামিল হবে। স্কুলের অধ্যক্ষ আরও উল্লেখ করেন যে, একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্যান্য ছাত্রীরাও নির্ধারিত ইউনিফর্মই মেনে চলছে।


‘স্কুল আগে হিজাব পরার অনুমতি দিয়েছিল’

ছাত্রীর অন্যতম একটি যুক্তি ছিল যে, স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেই রিজভিকে বেশ কয়েক বছর ধরে মাথায় স্কার্ফ পরার অনুমতি দিয়েছিল। তবে আদালত জানায়, অতীতে কোনও বিষয়কে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে মানেই এই নয় যে, প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীতে তার ইউনিফর্ম নীতি কার্যকর করতে পারবে না।

“অতীতে হয়তো স্কুল কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীর স্কার্ফ পরার বিষয়ে কোনও আপত্তি তোলেনি। তা উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা, ইচ্ছাশক্তির অভাব, ইউনিফর্ম নীতি কার্যকর না করা কিংবা সৌজন্যবোধ বা দ্বিধার কারণেই হোক না কেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, স্কুল যখন তাদের ইউনিফর্ম নীতি বা পোশাকবিধি কঠোরভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেবে, তখন তারা আর তা করতে পারবে না (অর্থাৎ, আগের সেই শিথিলতা তাদের বর্তমান পদক্ষেপের পথে কোনও আইনি বাধা বা ‘এস্টোপেল’ সৃষ্টি করবে না)।”

বিচারকরা আরও উল্লেখ করেন যে, স্কুল তাদের ইউনিফর্মে কোনও পরিবর্তন আনেনি। বিরোধের মূল বিষয় ছিল, সব ছাত্রছাত্রীর জন্য নির্ধারিত পোশাকের সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে মাথায় স্কার্ফ পরার জন্য ওই ছাত্রীর অনুরোধ।

আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, ইউনিফর্ম কেবল ছাত্রছাত্রীরা কী পরবে তা নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আরও অনেক উদ্দেশ্য রয়েছে, যেমন- শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রতিষ্ঠানের একটি অভিন্ন পরিচয় গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভেদাভেদ বা পার্থক্য কমিয়ে আনা। আদালত আরও বলে যে, অভিন্ন পোশাকবিধি একটি “ধর্ম-নিরপেক্ষ পরিবেশ” বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।


ইসলামে কি হিজাব বাধ্যতামূলক?

একজন মুসলিম হিসেবে হিজাব বা মাথার স্কার্ফ পরা তার জন্য বাধ্যতামূলক, শিক্ষার্থীর এই দাবি বিচারপতিদের বেঞ্চকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

বিচারপতিরা মন্তব্য করেন যে, শ্রেণিকক্ষে স্কার্ফ পরা যে আবশ্যিক বা এটি না পরলে শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস মৌলিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য বা ধর্মীয় দলিল আবেদনে ছিল না।

বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে যে, “যেখানেই এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে, সেখানেই হাইকোর্টগুলো সর্বসম্মতভাবে এই মত দিয়েছে যে, মুসলিম নারীদের জন্য হিজাব বা মাথার স্কার্ফ পরা ইসলামি বিশ্বাসের কোনও অপরিহার্য অংশ নয়। অর্থাৎ এটি না পরলে বিশ্বাস বিপন্ন হবে- এমনটি নয়।”

আদালত কেরল ও বোম্বে হাইকোর্টের পূর্ববর্তী কিছু রায় পর্যালোচনা করেছে। ওই মামলাগুলোতে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত ইউনিফর্মের বাইরে হিজাব পরার জন্য ছাড় চেয়েছিল।

এছাড়া আদালত কর্ণাটক হাইকোর্টের ২০২২ সালের ‘ফুল বেঞ্চ’-এর রায়টিও বিবেচনায় নেয়। ওই রায়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছিল যে, ইসলামে হিজাব পরা কোনও অপরিহার্য ধর্মীয় প্রথা নয়। কর্ণাটক হাইকোর্টের রায়টিকে “অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নজির” হিসেবে অভিহিত করে আদালত জানায়, “এ বিষয়ে ভিন্ন কোনও অবস্থান নেওয়ার কোনও কারণ আমরা দেখছি না।”

আদালত আরও উল্লেখ করে যে, মামলায় দাখিল করা ছবিতে দেখা গিয়েছে, ওই স্কুলের অন্যান্য ছাত্রীরা (যাদের মধ্যে একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ছাত্রীরাও রয়েছে) তারা হিজাব ছাড়াই নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরছে।

বিচারকরা বলেন, সাধারণ পোশাকবিধি বা ইউনিফর্মের নিয়ম থেকে ব্যক্তিগত কারণে বা নিজস্ব বিবেচনার ভিত্তিতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ দিলে ইউনিফর্ম প্রথার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে স্কুলের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাত থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের হাতে চলে যেতে পারে।


তথ্যসূত্র: আজকাল অনলাইন