শনিবার, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০২৬

সুগন্ধি চালের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে

ইরম তারান্নুমপ্রজ্ঞা ৩০ আগস্ট ২০২৬ ১০:০১ অপরাহ্ন বিশেষ প্রতিবেদন
ইরম তারান্নুমপ্রজ্ঞা ৩০ আগস্ট ২০২৬ ১০:০১ অপরাহ্ন
সুগন্ধি চালের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে

রাজশাহীতে ছয় মাস আগে যে পোলাওয়ের চাল ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে, এখন তার দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জীবনে তারা পোলাওয়ের চালের দাম এতো পরিমাণে বাড়তে দেখেননি।


এদিকে কৃষকেরা জানান, উৎপাদন মৌসুমে তারা যে দামে ধান বিক্রি করেছিলেন, এখন সেই দাম প্রায় দ্বিগুণ। তবে কোনো কৃষকের ঘরেই আর ধান নেই। ফলে সুগন্ধি চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতি।


কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অনেকের মতে, বিদেশে রফতানির কারণেই বাজারে সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল রফতানি করেছে। প্রধানত ব্রি-৩৪ (চিনিগুঁড়া) ধান থেকে সুগন্ধি চাল তৈরি হয়। বর্তমানে বাজারে গত আমন মৌসুমের ধানের চাল বিক্রি হচ্ছে।


জানা গেছে, পবিত্র উৎসব-পার্বণ কিংবা বাড়িতে হঠাৎ কোনো মেহমানের আগমন বাঙালির পাতে এক থালা সুগন্ধি চালের পোলাও বা বিরিয়ানি চিরাচরিত আতিথেয়তার প্রতীক। কোনো বিশেষ দিন, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা পরিবারের পছন্দের খাবার হিসেবে ঘরে ফিরত সুগন্ধি চাল। তবে রাজশাহীর বাজারে এখন সেই চালের দাম এখন অনেক পরিবারের হিসাব পাল্টে দিয়েছে। রাজশাহীর বাজারে কয়েক মাসের ব্যবধানে চিনিগুঁড়া, কালোজিরাসহ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি চালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকলেও অনেকে পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউবা সাধারণ চালেই ফিরছেন।


রাজশাহীর সাহেববাজার, উপশহর বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সুগন্ধি চালের এই অস্বাভাবিক চড়া দর। খোলা ও প্যাকেটজাত-দুই ধরনের চালের দামেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। চিনাগুড়া চাল (খোলা): কয়েক মাস আগেও রাজশাহীর বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকায়। চিনাগুড়া চাল (প্যাকেটজাত): শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর ১ কেজির প্যাকেটজাত চিনিগুড়া চাল আগে যেখানে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত। ঐতিহ্যবাহী দেশি কালিজিরা চালের কেজি ১২০-১২৫ টাকা থেকে বেড়ে ঠেকেছে ১৫০ টাকায়। দিনাজপুরের সুগন্ধি কাটারিভোগ চালের দামও কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায়।


সুগন্ধি চালের দাম বাড়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। আগে মাসে একবার কিংবা বিশেষ দিনে পোলাও রান্না করা হলেও এখন অনেক পরিবার হিসাব করে চাল কিনছে। চাল কিনতে আসা চাকরিজীবী আজাদ বলেন, পোলাওয়ের চাল প্রতিদিনের খাবার নয়। তারপরও দাম তো বেড়ে গেছে যে পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠানেও বেশি পরিমাণে কিনতে ভয় লাগে। চালের দামটা কেন এতো দ্রুত বাড়ছে, সেটাই আমাদের প্রশ্ন। 


সাহেব বাজারে চাল কিনতে আসা গৃহিণী সেলিনা পারভীন বলেন, সামনে মেয়ের জন্মদিন। ঘরে আত্মীয়স্বজন আসবে, পোলাও রান্না করতেই হবে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি খোলা চিনিগুড়া চালের দামও ১৪৫ টাকা। আগে যে টাকায় চার কেজি চাল কিনতাম, এখন সেই টাকায় তিন কেজি চালও মিলছে না। 


ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, শুধু খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়ার বিষয়টি দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। পাইকারি পর্যায়েই বর্তমানে সুগন্ধি চালের দাম বেশি। ফলে পরিবহন, দোকান পরিচালনার খরচ ও ব্যবসায়িক কমিশন যোগ হয়ে খুচরা বাজারে দাম আরও বাড়ছে। রাজশাহীর চাল-দোকানের এক বিক্রেতা বলেন, আগে যে দামে চাল আনতাম, এখন সেই দামে কিনতে পারছি না। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।


চাল ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন জানান, বিক্রি কমে যাওয়ার কথা। তিনি বলেন, দাম বাড়লে সবথেকে বেশি বিপাকে থাকি আমরা। কারণ তখন আমাদের বেচা বিক্রি কমে যায়। আগে যেখানে ক্রেতারা এসে একবারে ৫ বা ১০ কেজি সুগন্ধি চাল কিনতেন, এখন দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই মাত্র ১ বা ২ কেজি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। 


অর্থনৈতিক ও সরবরাহ ব্যবস্থার দৃষ্টিকোণ থেকে সুগন্ধি চালের দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে লক্ষণীয়। গত মৌসুমে তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় সুগন্ধি ধানের কাক্সিক্ষত ফলন ব্যাহত হয়েছিল, যার প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। বড় বড় চাল প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মৌসুমের শুরুতেই অতিরিক্ত দামে ধান কিনে মজুদ করে রাখায় স্থানীয় ছোট মিল ও খোলা বাজারে ধানের সংকট তৈরি হয়েছে। সুগন্ধি চাল বিশেষ প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পলিশিংয়ের মধ্য দিয়ে যায়। বিদ্যুৎ বিল, মিলিং খরচ এবং পরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।#