দখল আর দূষণে অস্তিত্ব সংকটে দুর্গাপুর হোজা নদী
এক সময় রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার হোজা নদী ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। বর্ষা এলেই নদী ভরে উঠত প্রবল স্রোতে। দেশীয় নানা প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যে জেলেদের মুখে ফুটত হাসি। নৌকায় করে মানুষ ও পণ্য পরিবহন ছিল নিয়মিত দৃশ্য। নদীপথেই চলত এলাকার গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই গৌরবময় হোজা নদী এখন শুধুই অতীত।
হোজা নদী বর্তমানে অবৈধ দখল ও দূষণের কবলে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দুর্গাপুর বাজারসংলগ্ন নদীর দুই তীরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অবৈধ ভাবে দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্গাপুর হোজা নদীর দুই পাশে বাজার এলাকায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টি স্থানে অবৈধভাবে দখল করে রাখা হয়েছে। কোথাও পাকা ভবন, কোথাও পাকা ও টিনের চালা তুলে দোকানঘর, আবার কোথাও বেড়া দিয়ে নদীর জমি দখল করে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে নদীর জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দুর্গাপুর বাজার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় প্রভাবসালী এক ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পাশাপাশি নদীর অংশও দখল করে গড়ে তুলেছেন দ্বিতল ভবন। একইভাবে আরেকজন ব্যবসায়ী নদীর জায়গা দখল করে পাকা দোকান নির্মাণ করেছেন।
এছাড়া নদীর জায়গা দখল করে বাসের আড়ৎ, কিছু অংশে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনা গড়ে তুলেছে বলেও জানা গেছে। এদিকে পুরো নদী জুড়ে নদীর তীরবর্তী অনেক বসবাসকারিরা নিজেদের সুবিধামতো নদীর পাড় দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ ও ফাকা স্থান ঘিরে ফসল উৎপাদন করছে।
অন্যদিকে, নদীজুড়ে বিভিন্ন বাসাবাড়ি, দোকানপাট, হোটেল ও রেস্তোরাঁর ময়লা-আবর্জনা সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর আবাসও হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দলন (বাপা) একাধিকবার এ নদী দখল ও দূষণের প্রতিবাদে বিক্ষোব ও মানববন্ধন কলেও এর কোনো প্রতিকার হয়নি। পরিবেশবিদরা মনে করছেন এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীটি তার স্বাভাবিক অস্তিত্ব হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল মালেন জানান, ‘ আমরা এক সময় দেখেছি হোজা নদীতে সারা বছর নৌকা চলাচল করত। বর্ষা মৌসুমে নদী থাকত পানিতে টইটম্বুর। জেলেরা প্রচুর মাছ শিকার করতেন এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষের জীবিকা সমৃদ্ধ ছিল। বিগত প্রায় তিন দশক ধরে দেখে আছি নদীর দুইপাশ দখল, দুষণ, আর পলি জমে নাব্যতা হারানোর কারণে দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে নদীটি আজ তার অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।’
হোজা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করা আব্দুস সামাদ জানান, ‘এক সময় এই হোজা নদী ছিল আমাদের জীবন-জীবিকার প্রধান ভরসা। আমার বাবা-দাদারাও এই নদীতে মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন। তাদের দেখেই আমরাও মাছ ধরা শিখেছি। তখন নদীতে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রভাবশালীদের দখল, নাব্যতা হারানো ও দূষণের কারণে নদীটি বর্তমানে প্রায় মৃত। আগের মতো মাছ আর মেলে না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা অন্য পেশায় চলে গেছি। তার মতো শত শত জেলে মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দলন (বাপা) দুর্গাপুর উপজেলা শাখার সভাপতি মোহাইমিনুল হক রেন্টু বলেন, আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি বর্তমান সরকার এ নদীটি সংস্কারের জন্য অর্থ ছাড় করেছেন। আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হোজা নদীকে দখল ও দুষণ মুক্ত করে পুন খনন সংস্কারের মাধ্যমে নদী তার জৈবন ফিরে পাবে।
এবিষয়ে দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে হাবিবা ফারজানা বলেন, ‘এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হয়নি। খোঁজ খবর নেই, এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে আলোচনা করে অবশ্যই এটাকে কি ভাবে দুষণ মুক্ত করা যায়। এবং অবৈধ দখলদার থাকলে তাদের উচ্ছেদ করা ও খনন করা সংক্রান্ত যে ব্যবস্থা নেয়া দরকার সেটা অবশ্যই নেয়া হবে।’