পাতিলে ভাসছে স্বপ্ন : রেনু পোনা বহন করে বদলে গেছে আদমদীঘির দুই হাজার পরিবারের জীবন
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কাঁধে পাতিল তুলে পথ ধরেন রাজ্জাক, খলিল, রইচ, আলতাফ, শহিদুল ও আলীম। পাতিল ভর্তি মাছের রেনু পোনা নিয়ে তারা ছুটে চলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কারও গন্তব্য ময়মনসিংহ, কারও ঢাকা, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, সিলেট, দিনাজপুর কিংবা পার্বতীপুর। আবার অনেকেই গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে পুকুরের পাড়ে পৌঁছে দেন জীবনের নতুন সম্ভাবনা মাছের রেনু পোনা।
এক সময় এই মানুষগুলোর জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে অভাব, অনটন আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে। অন্যের জমিতে দিনমজুরি ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সময় বদলেছে। অল্প পুঁজিতে রেনু পোনা বহনের এই পেশাই তাদের জীবনে এনে দিয়েছে স্বচ্ছলতা। আজ তারা শুধু নিজেদের পরিবারই নয়, বদলে দিয়েছেন গ্রামের অর্থনীতির চিত্রও।
পশ্চিম বগুড়ার মাছের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত আদমদীঘি উপজেলা এবং দেশের সর্বোচ্চ রেনু উৎপাদনকারী উপজেলা আদমদীঘি। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষ সরাসরি রেনু পোনা বহনের সঙ্গে জড়িত। তাদের হাত ধরে স্বাবলম্বী হয়েছে আরও প্রায় ১০ হাজার পরিবার। প্রতিদিন একজন শ্রমিক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন। সেই আয়েই চলছে সংসার, সন্তানদের লেখাপড়া, এমনকি অনেকেই গড়ে তুলেছেন পাকা বাড়ি। কেউ কিনেছেন ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী। আবার কেউ সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছেন। অনেকেই আজ ছোট উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
রেনু পোনা ব্যবসায়ী রাজ্জাক বলেন, “একসময় দিনমজুরি করে সংসার চালাতে হতো। এখন নিজের কাজ করি। প্রতিদিন যা আয় হয়, তাতে সংসার ভালোভাবেই চলে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাও করাতে পারছি।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান খলিল ও আলীম। তারা বলেন, “রেনু পোনা বহনের কাজ কষ্টের হলেও এতে সম্মান আছে, আয়ও ভালো। এখন আর অন্যের কাছে কাজের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।”
স্থানীয়দের মতে, আদমদীঘিতে গড়ে ওঠা দুই শতাধিক ছোট-বড় মৎস্য হ্যাচারিকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়েছে এই কর্মসংস্থান। হ্যাচারি থেকে উৎপাদিত রেনু পোনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দিয়ে একদিকে যেমন মাছ চাষের সম্প্রসারণ হচ্ছে, অন্যদিকে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশিষ্ট মৎস্য ব্যবসায়ী ও হ্যাচারি মালিক বেলাল হোসেন সরদার বলেন, “আদমদীঘির হ্যাচারিগুলোকে ঘিরে শত শত শিক্ষিত বেকার যুবক নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পেয়েছেন। অনেকে মাছ চাষ করছেন, আবার অনেকে রেনু পোনা বিক্রি ও বহনের মাধ্যমে ভালো আয় করছেন। এই পেশা অনেক পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।”
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও স্বর্ণপদক প্রাপ্ত মৎস্য খামারি আব্দুল মহিত তালুকদার-এর মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক পরিবহন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে আদমদীঘির এই সম্ভাবনাময় খাত আরও বিকশিত হবে। তখন শুধু দুই হাজার নয়, আরও বহু পরিবার রেনু পোনার সঙ্গে ভাসাবে তাদের স্বপ্নও।
আদমদীঘির রাস্তায় কাঁধে পাতিল নিয়ে হাঁটা মানুষগুলো তাই শুধু রেনু পোনা বহন করেন না,তারা বহন করেন হাজারো পরিবারের আশা, স্বপ্ন আর বদলে যাওয়া জীবনের গল্প।