শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬

ভূগর্ভে ফের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে ইরান

সোনার দেশ ডেস্ক ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৫ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৫ অপরাহ্ন
ভূগর্ভে ফের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে ইরান
ছবি: এএফপি

মজুত থাকা বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আবারও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি শুরু করেছে ইরান। দেশটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এ তথ্য জানিয়েছেন। এর ফলে যুদ্ধের বড় অর্জন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে দাবি করে আসছিল, তা অনেকটাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।


যুদ্ধ শুরুর দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা ও শিল্পকারখানায় ব্যাপক হামলা চালানো হলেও দেশটি এখন আবার লিকুইড ফুয়েল বা তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ঠিক আগে জ্বালানি ভরতে হয়। পাশাপাশি সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র আগে থেকেই প্রস্তুত অবস্থায় সংরক্ষণ করা যায়। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।


গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কয়েকটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আবার তৎপরতা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের খোজির ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এসব স্থাপনা আবার হামলার শিকার না হয়, সে জন্য নতুন ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন কেন্দ্র তৈরির চেষ্টা করছে ইরান।


যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত ইরান মূলত আগে থেকে মজুত থাকা উপাদান দিয়ে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন করছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অবশ্য এর পরিমাণ সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া নৌ অবরোধের কারণে ক্ষেপণাস্ত্রের কঠিন জ্বালানি তৈরির উপাদান ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ আমদানিও কঠিন হয়ে পড়েছে।


ইরানের এই পুনরুৎপাদন শুরু দেখিয়ে দিচ্ছে, তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা কতটা কঠিন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন আবার শুরু হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে টিকে থাকার সক্ষমতাও ইরানের বাড়ছে। এই যুদ্ধে একদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত ক্রমেই কমছে।


যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মিসাইল ডিফেন্স অ্যাডভোকেসি অ্যালায়েন্সের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তাল ইনবার বলেন, ‘স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো আবার তৈরি করা যায়। অন্য দেশ থেকেও নতুন উপাদান কেনা যায় এবং সেগুলো স্থাপনাগুলোতে মজুত করা যায়। ইরান যে তার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে না, এমনটা ভাবতে হলে অত্যন্ত সরল বিশ্বাসী হতে হবে।’


হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা তেহরান আবার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করেছে কি না, সে প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেননি। তবে তিনি বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে এবং দেশটির সামরিক বাহিনী ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দুর্বল এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেবেন না।’


পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ‘ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ সামরিক শিল্পভিত্তির ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ধ্বংস করেছে’ এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের সক্ষমতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে’।


যুদ্ধের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র, সংরক্ষণাগার, ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হাজার হাজার হামলা চালানো হয়। কিন্তু চলতি গ্রীষ্মে যুদ্ধের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইরান আবার তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে। তেহরান মনে করছে, বর্তমান যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা বলেন, জুনের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে প্রাথমিক একটি চুক্তি করার পর ইরান সম্ভবত কম মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন আবার শুরু করে। ওই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে আলোচনা শুরুর কথা ছিল।


ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানের কাছে মজুত থাকা উপাদান দিয়ে অন্তত কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্র সংযোজন করার সক্ষমতা থাকার কথা।


লন্ডনের কিংস কলেজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং ইরানের সামরিক বাহিনী নিয়ে কাজ করা সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক জিম ল্যামসন বলেন, যুদ্ধের আগে ইরান বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের উপাদান মজুত করে রেখেছিল। এর মধ্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ওয়ারহেড, ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো এবং নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল। তিনি ইরানের প্রকাশ করা পুরোনো ছবি ও ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন। এসব ছবি ও ভিডিওতে ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর দেয়ালের পাশে এ ধরনের বহু উপাদান সারিবদ্ধভাবে রাখা অবস্থায় দেখা যায়।


ইরান কতগুলো নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে, তা নির্ভর করছে তাদের মজুত কতটা বড় এবং কতগুলো ভূগর্ভস্থ স্থাপনা বর্তমানে কার্যকর রয়েছে তার ওপর। ল্যামসন বলেন, ‘আমরা কয়েক শ ক্ষেপণাস্ত্রের কথা বলতে পারি, আবার সম্ভবত কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্রও হতে পারে।’


যুদ্ধের সময় ইরান তার প্রস্তুত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যবহার করেছে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে দেশটিকে হামলার মাত্রা কমাতে হয়েছে। তবে দেশটির এখনো উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা রয়েছে। ইনবারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরানের অস্ত্রভান্ডারে এখনো কয়েক হাজার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে ইরান এখনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলার মধ্য দিয়ে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডারের বৈচিত্র্যও দেখা যাচ্ছে। ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে খেইবার শেকান অন্যতম। এটিকে মোবাইল, নির্ভুল এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে উৎপাদনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।


গত বুধবার জর্ডানের একটি বিমানঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। ওই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা অবস্থান করছেন। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর কয়েকটিতে ক্লাস্টার ওয়ারহেড ছিল। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করতে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রায়ই ব্যবহার করেছিল ইরান।


এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ইরানের নেই। হেগসেথ তখন বলেছিলেন, ‘আপনারা অবশিষ্ট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাটি খুঁড়ে বের করছেন, কিন্তু সেগুলো প্রতিস্থাপনের কোনো সক্ষমতা আপনাদের নেই। আপনাদের কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প নেই, আক্রমণাত্মক বা প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা পুনরায় পূরণ করার কোনো সক্ষমতা নেই।’


আরব ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এখন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কয়েকবার বড় ধরনের বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হলেও কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজে আঘাত লাগেনি।


স্যাটেলাইট ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে, সেতু ও সড়ক থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র পর্যন্ত ইরান দ্রুত পুনর্র্নিমাণ করছে। এ গতিতে পুনর্গঠনের বিষয়টি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বলে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে।


ইরান এমনকি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর সুড়ঙ্গের প্রবেশপথও আবার খুলে ফেলেছে। এসব প্রবেশপথ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ধসে পড়েছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর ভেতরে সংরক্ষণ করা অস্ত্রগুলো সম্ভবত ভালো অবস্থায় রয়েছে। তবে ইরানের পূর্ণ মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ফিরে যাওয়ার পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। আরব কর্মকর্তারা জানান, তরল জ্বালানি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি কঠিন জ্বালানি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় শিল্পকারখানার মিক্সারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


আধুনিক বিমানবাহিনী না থাকায় ইরান ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি গড়ে তোলে। এরপর থেকে শত্রুদের প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে দেশটি ক্রমেই ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পরও ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করার সক্ষমতা দেখিয়েছিল। ওই যুদ্ধে ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে লক্ষ্য করে হামলা চালালেও ইরান প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত তার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়। এর ফলে বছরের শেষ দিকে ইসরায়েল সতর্ক করে বলেছিল, ইরানের বিরুদ্ধে আরও হামলার প্রয়োজন হতে পারে।


প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরানবিষয়ক কৌশল বিশেষজ্ঞ নিকোল গ্রাজেভস্কি বলেন, ‘আপনি স্থাপনা ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারেন, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এর পুনর্গঠন সক্ষমতা পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও দ্রুত এবং এটি বেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ইরান যে এত বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো তৈরি করেছিল, তার কারণ ছিল তারা এ ধরনের হামলার আশঙ্কা করেছিল।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা অনলাইন