রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬
যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান

জব্দ গাড়ির রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই আরএমপির

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০০ অপরাহ্ন
জব্দ গাড়ির রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই আরএমপির

রাজশাহী নগরীতে প্রতিদিন বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। এর সঙ্গে বাড়ছে অবৈধ, ফিটনেসবিহীন ও আইন অমান্যকারী যানবাহনও। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। মামলা, জরিমানা হচ্ছে, জব্দও করা হচ্ছে অনেক যানবাহন। কিন্তু অভিযান শেষে জব্দ করা গাড়ি রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই পুলিশের।


এই স্থান সংকটই এখন রাজশাহী নগরীতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থায়ী ও পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় চাইলেও একসঙ্গে বেশিসংখ্যক যানবাহন আটক করতে পারছে না পুলিশ। অনেক ক্ষেত্রে মামলা বা জরিমানা করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে আইন অমান্যকারী যানবাহন। পরে সামান্য জরিমানা দিয়ে একই গাড়ি আবারও সড়কে নামছে।


১৯৯২ সালের ১ জুলাই চারটি থানা নিয়ে যাত্রা শুরু করে আরএমপি। সময়ের সঙ্গে মহানগরের আয়তন, থানার সংখ্যা, যানবাহন ও পুলিশের দায়িত্ব বেড়েছে। বর্তমানে আরএমপির অধীনে ১২টি থানা ও বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট রয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়েও ট্রাফিক বিভাগের জন্য গড়ে ওঠেনি স্থায়ী ও পর্যাপ্ত ডাম্পিং স্টেশন।


ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, ডাম্পিং স্টেশন শুধু জব্দ করা গাড়ি রাখার জায়গা নয়; এটি আইন প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। কোনো যানবাহন আটক করার পর সেটি নিরাপদে সংরক্ষণের দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু জায়গার সংকট থাকায় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যানবাহন জব্দ করে রাখা সম্ভব হয় না। ফলে অভিযান চালানোর সময় পুলিশকে অনেক ক্ষেত্রে আগে ভাবতে হয়, আটক করা গাড়ি রাখবে কোথায়।


ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ১০০টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলেও যদি ২০টি গাড়ি রাখার জায়গা থাকে, তাহলে বাস্তবে ১০০টি গাড়ি আটক করা সম্ভব নয়। কারণ আটক করা গাড়িগুলো নিরাপদে রাখার দায়িত্ব পুলিশের।


বর্তমানে হেলেনাবাদ এলাকায় একটি সরকারি কোয়ার্টারের পাশে ছোট একটি জায়গা অস্থায়ী ডাম্পিং হিসেবে ব্যবহার করছে আরএমপি ট্রাফিক বিভাগ। জায়গাটি মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) কোয়ার্টারের অংশ। আবাসিক এলাকার এই জায়গা ছেড়ে দিতে ট্রাফিক বিভাগকে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে পিডব্লিউডি। তবে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আপাতত জায়গাটি ব্যবহারের সুযোগ রাখার জন্য অনুরোধ করেছে ট্রাফিক বিভাগ।


অল্প জায়গায় বেশি গাড়ি জমে যাওয়ায় সেখানে নতুন করে জায়গার সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে অটোরিকশা ও অন্যান্য তিন চাকার যানবাহন আটক করার ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও বেশি। এর বাইরে মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মিনিবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধেও নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হয় পুলিশকে।


ট্রাফিক বিভাগ ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযানে মহানগরে প্রতিদিনই আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে জব্দ করা গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সব ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


এর প্রভাব পড়ছে নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তায়। সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, মনিচত্বর, কাদিরগঞ্জ, রেলগেট ও তালাইমারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যানবাহনের চাপ, যত্রতত্র পার্কিং ও সড়কে বিশৃঙ্খলার কারণে যানজট তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।


রাজশাহীর হেতেম খাঁ এলাকার বাসিন্দা আদিত্য রায় বলেন, রাজশাহীতে যানবাহনের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়েছে। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটছে। ট্রাফিক পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে লাইসেন্সবিহীন ও আইন অমান্যকারী যানবাহন চলাচল করে। পুলিশ এসব গাড়ি আটক করে জব্দ করতে পারলে সড়কে অনিয়ম কমতো।


স্থানীয় বাসিন্দা এজাজ মাহমুদ বলেন, রাজশাহী বাংলাদেশের অন্যতম ক্লিন সিটি। কিন্তু শহরের পরিবেশ ও সড়ক ব্যবস্থা সঠিকভাবে রক্ষা করা যাচ্ছে না। অটোরিকশার কারণে অনেক সময় রাস্তা দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক যানবাহনের রাজশাহী সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স নেই। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।


‘নিরাপদ সড়ক চাই’- রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলেন, অতিরিক্ত অবৈধ যানবাহন, চালকদের অসাবধানতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ট্রাফিক পুলিশের জন্য আলাদা ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় আইন প্রয়োগের কাজও ব্যাহত হচ্ছে।


তিনি বলেন, রাজশাহীর সড়কগুলোতে নিরাপদ গতিতে চলাচল উত্তম। মহানগরীতে যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট গতিসীমা করা উচিত। বেশি গতিতে গাড়ি চললে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।


রাজশাহী মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বলেন, মহানগরের আয়তন ও যানবাহন দুটোই বেড়েছে। এ অবস্থায় ট্রাফিক বিভাগের জন্য একটি স্থায়ী ও নিরাপদ ডাম্পিং স্টেশন জরুরি। মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় এলাকাভিত্তিক ডাম্পিং স্টেশন থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়। অন্তত একটি বড় ও পর্যাপ্ত জায়গার স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন হলে বিপুলসংখ্যক জব্দ করা যানবাহন নিরাপদে রাখা সম্ভব হবে।


তিনি বলেন, ডাম্পিং স্টেশন থাকলে শুধু যানবাহন রাখার সমস্যাই মিটবে না, আইন অমান্যকারী গাড়ির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও বাড়বে। মামলা, মালিকানা ও আদালতের আদেশের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও সেখানে রাখা যেতে পারে।


আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, ডাম্পিং স্টেশন তৈরি হলে নগরের যানজট, অবৈধ পার্কিং ও সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে নিবন্ধন ও চেসিস নম্বরবিহীন অবৈধ অটোরিকশা আটক করে ডাম্পিংয়ে পাঠানো গেলে এসব যানবাহনের সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।