মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

শরৎচন্দ্র নিজে চাননি সিনেমায় উঠে আসুক তাঁর ‘ইম্মরাল’ গল্পটি, তবু প্রমথেশ-দিলীপকুমার-শাহরুখ ছুঁয়ে একশো বছর ধরে জীবন্ত ‘দেবদাস’

সোনার দেশ ডেস্ক ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:৪২ অপরাহ্ন বিনোদন
সোনার দেশ ডেস্ক ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০২:৪২ অপরাহ্ন
শরৎচন্দ্র নিজে চাননি সিনেমায় উঠে আসুক তাঁর ‘ইম্মরাল’ গল্পটি, তবু প্রমথেশ-দিলীপকুমার-শাহরুখ ছুঁয়ে একশো বছর ধরে জীবন্ত ‘দেবদাস’

সাহিত্য সমালোচকেরা বলেন, ‘দেবদাস’ উপন্যাসের সাহিত্যগুণ তেমন অসাধারণ নয়। শুধু সমালোচকেরা কেন, এই উপন্যাস লিখে প্রায় সাত বছর ধরে ফেলে রেখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই। ছাপার যোগ্য মনে হয়নি তাঁর। ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার অন্যতম কর্ণধার তথা বন্ধুবর প্রমথনাথ ভট্টাচার্য উপন্যাসটি ছাপার অনুরোধ করলে শরৎবাবু নিজে তাঁকে জানান, ‘নিও না, নেবার চেষ্টাও কোরো না। ওটা ইমমর‌্যাল’। কিন্তু, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আবহে ১৯১৭ সালে, স্রষ্টার কথা না রেখেই প্রকাশিত হয় ‘দেবদাস’। যার প্রেমে পড়ে আপামর বাঙালি। যে দেবদাসের বিরহ-যন্ত্রণা আজও তাড়া করে পাঠককে। সেই বিরহের টানেই হয়তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, নানা ভাষার চিত্র পরিচালককে আকর্ষণ করেছে দেবদাস-পার্বতী-চন্দ্রমুখী।


বার বার বড়পর্দায় ফিরে এসেছে ‘দেবদাস’। কখনও একেবারে হুবহু উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে এসে জীবন্ত হয়েছে চরিত্রগুলি। কখনও আবার তাতে মিশেছে আধুনিকতা, সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষাপট। নির্বাক ছবি থেকে সাদাকালো পেরিয়ে রঙিন, কখনও বাংলা, কখনও হিন্দি, কখনও উর্দু বা অসমিয়া— বিভিন্ন পরিচালকের তৈরি ও নানা তারকার অভিনীত যে যে ‘দেবদাস’ সিনেমারসিকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে, রইল তার তালিকা।


১৯২৮ সালে প্রথম বার বড়পর্দায় দেখা যায় দেবদাসকে। নরেশ মিত্রের পরিচালনায় প্রথম ‘দেবদাস’ মুক্তি পায়। সেটি ছিল নির্বাক ছবি। দেবদাসের চরিত্রে ফণী বর্মা। পার্বতীর চরিত্রে অভিনয় করেন তারকবালা বসু। এই তারকবালা হলেন মান্না দে’র কাকা বিখ্যাত গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে’র স্ত্রী। চন্দ্রমুখীর চরিত্রে অভিনয় করেন নীহারবালা সরকার। তবে সেই ছবি চাইলেও আর দেখা যাবে না। ছবির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গিয়েছে বহুকাল আগেই।


এর পরে ১৯৩৫ সালে প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালনায় প্রথম সবাক ‘দেবদাস’-এর আগমন। নিউ থিয়েটার্স-এর প্রযোজনায় তৈরি সেই ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন পরিচালক স্বয়ং। পার্বতীর চরিত্রে দেখা যায় যমুনা বড়ুয়াকে। চন্দ্রমুখীর চরিত্রে অভিনয় করেন চন্দ্রাবতী দেবী। বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য লাভ করে এই ছবি। তবে শোনা যায়, শরৎচন্দ্র নিজেই নাকি প্রমথেশকে এই ছবিটি তৈরি করতে বারণ করেছিলেন। পরে অবশ্য পরিচালক তাঁকে রাজি করান। উল্লেখ্য, প্রমথেশের পরিচালনায় মোট তিনটি ভাষায় ‘দেবদাস’ তৈরি হয়েছিল। 


বাংলায় সফল ‘দেবদাস’ মুক্তির পরের বছর, ১৯৩৬ সালে হিন্দিতে ‘দেবদাস’ তৈরি করেন প্রমথেশ। নায়ক কুন্দনলাল সায়গল, পার্বতীর চরিত্রে আবার যমুনা বড়ুয়া। চন্দ্রমুখী হন রাজকুমারী দেবী। সাফল্য পায় সেটিও। এর পরে অসমের ছেলে প্রমথেশ ১৯৩৭ সালে অসমিয়াতেও একটি ‘দেবদাস’ তৈরি করেন। মূল চরিত্রে ছিলেন ফণী শর্মা। পার্বতীর চরিত্রে জ়ুবেইদা ও চন্দ্রমুখীর চরিত্রে ছিলেন মোহিনী। এই ছবির সাফল্য অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় ‘দেবদাস’ তৈরিতে অনুপ্রাণিত করে নির্মাতাদের। এই তিনটি ছবির মধ্যে শুধুমাত্র বাংলা ‘দেবদাস’-এর সেলুলয়েডের মূল কপিই পাওয়া গিয়েছে। বাকি দু’টির খোঁজ পাওয়া যায়নি। 


১৯৫৩ সালে ‘দেবদাস’ তৈরি হয় তেলুগু ও তামিল ভাষায়। প্রমথেশ বড়ুয়ার ধারা মেনে আবার হিন্দিতে তৈরি হয় ‘দেবদাস’। নজর কাড়ে ১৯৫৫ সালে মুক্তি পাওয়া বিমল রায় পরিচালিত সেই ‘দেবদাস’। মুখ্য চরিত্রে দিলীপ কুমার। দেবদাসের সঙ্গে দিলীপকুমার যেন মিলেমিশে একাকার। পার্বতীর চরিত্রে সুচিত্রা সেন, চন্দ্রমুখী হন বৈজয়ন্তীমালা। প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে এই ছবি। সমালোচকদের মতে, এটিই ‘দেবদাস’ উপন্যাসের সবচেয়ে সঠিক চিত্রায়ণ। উল্লেখ্য, ১৯৩৬ সালে হিন্দিতে যে ‘দেবদাস’ তৈরি করেন প্রমথেশ, সেটির ক্যামেরাম্যান ছিলেন এই বিমল রায়ই। 


বিমল রায়ের ‘দেবদাস’-এ পার্বতীর চরিত্রের প্রস্তাব প্রথমে যায় মীনা কুমারীর কাছে। কিন্তু, তাঁর স্বামীর কিছু শর্ত ছিল, যা মানতে রাজি হননি পরিচালক। তখন পরিচালকের মনে হয়, এই চরিত্রের জন্য কোনও বাঙালি অভিনেত্রীকে নেওয়াই ঠিক হবে। নেওয়া হয় সুচিত্রা সেনকে। চন্দ্রমুখীর চরিত্রের প্রস্তাব যায় প্রথমে নার্গিস, পরে সুরাইয়ার কাছে। কিন্তু, দু’জনেই ‘দ্বিতীয় নায়িকা’র ভূমিকায় অভিনয় করতে রাজি হননি। নৃত্যপটিয়সী বৈজয়ন্তীমালা তখন উঠতি নায়িকা। চন্দ্রমুখীর চরিত্রের প্রস্তাব এককথায় লুফে নেন তিনি।


১৯৬৫ সালে পাকিস্তানে তৈরি হয় ‘দেবদাস’, উর্দু ভাষায়। পরিচালনা করেন খাজা সরফরাজ়। দেবদাসের ভূমিকায় হাবিব তালিশ, পার্বতীর ভূমিকায় শামিম আরা, চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় নায়ার সুলতানা। সেই বছরে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধও হয়েছিল। তবে প্রেম আর কবে গোলাবারুদকে ভয় পেয়েছে? সীমানা পেরিয়ে পড়শি রাষ্ট্রে জনপ্রিয় হল দেবদাসের বিরহ। বক্সঅফিসে মোটামুটি সাফল্য লাভ করে ছবিটি। সে দেশের সমালোচকেরা বিশেষ প্রশংসা করেন শামিমের অভিনয়ের। 


১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় বাংলায় তৈরি দ্বিতীয় ‘দেবদাস’ ছবি। দিলীপ রায় পরিচালিত এই ছবিতে দেবদাসের ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পার্বতীর চরিত্রে সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় ও চন্দ্রমুখীর চরিত্রে সুপ্রিয়া চৌধুরী অভিনয় করেন। চুনিলালের চরিত্রে এই ছবিতে অভিনয় করেন উত্তমকুমার। নজরকাড়া ‘স্টারকাস্ট’ হওয়া সত্ত্বেও, শোনা যায় এই ছবি বাঙালির মনে বিশেষ দাগ কাটতে পারেনি। চুনিলালের চরিত্রে উত্তমকে মেনে নিলেও সৌমিত্রের অভিনীত দেবদাসকে মেনে নিতে পারেনি দর্শক। 


এর পরে ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে তৈরি হয় ‘দেবদাস’। চাষী নজরুল ইসলামের তৈরি ছবিতে ছিলেন বুলবুল আহমেদ, কবরী সারোয়ার ও আনোয়ারা। প্রবল সাফল্য লাভ করে বাংলাদেশে এই ছবিটি। ১৯৮৯ সালে মলয়ালম ভাষায় মুক্তি পায় ক্রসবেল্ট মণির ‘দেবাদাস’। অভিনয় করেন বেনু নাগাবল্লী , পার্বতী এবং রামাইয়া কৃষ্ণা।


এর পরে বক্সঅফিসে ঝড় তোলে সঞ্জয় লীলা ভন্সালী পরিচালিত ‘দেবদাস’। ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিতে দেবদাসের ভূমিকায় অভিনয় করেন শাহরুখ খান। পার্বতীর ভূমিকায় ঐশ্বর্যা রায় বচ্চন ও চন্দ্রমুখীর চরিত্রে ছিলেন মাধুরী দীক্ষিত। এই ছবিতে একেবারে বলিউডের ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ আবহ তৈরি করেন পরিচালক। বিশাল জমকালো সেট, দারুণ পোশাক, অসাধারণ গান-নাচ— জাঁকজমকে মুগ্ধ হন দর্শক। 


শাহরুখ খান নিজে স্বীকার করেছিলেন যে, এই ছবিতে প্রথমে তিনি কাজ করতে চাননি। পরিচালকের থেকে প্রস্তাব পেয়ে তা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন অভিনেতা। তাঁর মনে হয়েছিল যে, এই চরিত্রের জন্য তিনি মানানসই নন। যদিও সঞ্জয়ের জেদের সামনে হার স্বীকার করেন অভিনেতা। এক বছর পরে রাজি হন তিনি। একই সঙ্গে শাহরুখ জানান যে, দেবদাসের মতো পুরুষদের তিনি বিশেষ পছন্দ করেন না।


ওই একই বছর মুক্তি পায় কলকাতায় নির্মিত বাংলা ছবি ‘দেবদাস’। শাহরুখ অভিনীত হিন্দি ছবিটির আগেই মুক্তি পায় সেটি। শক্তি সামন্ত পরিচালিত বাংলা ছবিটিতে অভিনয় করেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অর্পিতা পাল এবং ইন্দ্রাণী হালদার। এখানে চুনিলালের ভূমিকায় ছিলেন তাপস পাল। বক্সঅফিসে সে ভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি এই ছবি। 


২০০৯ সালে মুক্তি পায় অনুরাগ কাশ্যপ পরিচালিত ‘দেব ডি’। শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’-এর কাহিনিকে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অন্য ভাবে উপস্থাপন করা হয়। অভিনয় করেন অভয় দেওল, মাহী গিল ও কল্কি কেঁকলা। ‘ব্ল্যাক কমেডি ড্রামা’ ঘরানার এ ছবিটিও বেশ সফল হয় বক্সঅফিসে। 


২০১৩ সালে বাংলাদেশে চাষী নজরুল ইসলাম আবার নতুন ভাবে ‘দেবদাস’ নির্মাণ করেন। দেবদাসের ভূমিকায় শাকিব খান, পার্বতীর চরিত্রে অপু বিশ্বাস এবং চন্দ্রমুখী হন মৌসুমী। এই ছবি বক্সঅফিসে দারুণ সফল হয়। তিন জনের অভিনয়ই সমালোচকদের প্রশংসা পায়। 


পাকিস্তানে ‘দেবদাস’ পরে আবার তৈরি হয়, ২০১০ সালে। কিন্তু, আর্থিক জটে আটকে সেই ছবি আর মুক্তি পায়নি। এর পর, ২০১৫ সালে করাচি ও লাহৌরে মুক্তি পায় ইকবাল কাশ্মীরি পরিচালিত ‘দেবদাস’। ছবিতে দেবদাসের চরিত্রটি করেন নাদিম শাহ, পার্বতী করেন জ়ারা শেখ ও চন্দ্রমুখী করেন মীরা। ওই ছবিটিতে গান করেছিলেন আশা ভোসলে, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, অলকা যাজ্ঞিক, সোনু নিগম, শ্রেয়া ঘোষাল। তবে ছবিটি বক্সঅফিসে ব্যর্থ হয়।


ছোটবেলার বন্ধুত্ব, বড় হয়ে প্রেম, কিন্তু তা পরিণতি না পাওয়া, নিজের ভালবাসার মানুষকে অন্যের ঘরনি হতে দেখা, বিরহে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া— এটিই ‘দেবদাস’-এর মূল কাহিনি। কিন্তু, অনেক পরিচালকই নাকি ভেবেছিলেন, দেবদাস ও পার্বতীর মিলন ঘটাবেন। ঘোর আপত্তি তোলেন প্রযোজকেরা। তাঁদের মনে হয়েছিল, দেব-পারুর মিলন ছবির ভরাডুবি ডেকে আনতে পারে। সিনেমারসিকদের মতে, তাঁরা ঠিকই ভেবেছিলেন। উপন্যাসে দেবদাস-পার্বতীর বিচ্ছেদ-যন্ত্রণাই দর্শককে মোহিত করে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রমাণিত।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন