শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬

গতিপথ বদলে পদ্মায় বিপজ্জনক ঘূর্ণি

নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১২ পূর্বাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১২ পূর্বাহ্ন
গতিপথ বদলে পদ্মায় বিপজ্জনক ঘূর্ণি

রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া পয়েন্টে এ বছর পদ্মার পানি সর্বোচ্চ ১৭.৩৩ মিটারে পৌঁছেছে, যা বিপদসীমার মাত্র ২ ফুট ৪ ইঞ্চি নিচে। পানির এই উচ্চতার কারণে ইতোমধ্যে বুকসমান পানিতে ডুবে গেছে চরখিদিরপুর, চরখানপুর ও মিডিলচরের মতো জনবসতি। 


গবেষণা বলছে, টি-বাঁধ ও গাইডওয়াল দিয়ে শহর রক্ষা করা সম্ভব হলেও পদ্মার মূল স্রোত পূর্ব থেকে পশ্চিমে সরে যাচ্ছে। ফারাক্কার প্রভাব, শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়া, বর্ষায় অতিরিক্ত পলি জমা, যেখানে-সেখানে বাঁধ-সেতু নির্মাণ এবং অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতি-প্রকৃতি মারাত্মকভাবে বদলে গেছে।


বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাত তখন প্রায় ৯টা। দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে নদীপাড়ের মানুষ যখন ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বদলে গেল পদ্মার চেহারা। শান্ত নদী মুহূর্তেই যেন উত্তাল হয়ে উঠল। একের পর এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকল তীরে।


স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল আতঙ্ক ছড়ানোর মত। অন্ধকার রাতে এমন ভয়াবহ ঢেউ দেখে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। কেউ ছুটেছেন ঘরবাড়ি রক্ষায়। কেউ আবার নদীতে থাকা নৌকা উদ্ধারে।


নৌকাগুলো শুধু নদীতে চলাচলের বাহন নয়। অনেক পরিবারের কাছে এগুলোই জীবিকা অবলম্বন। মাছ ধরা, যাত্রী পারাপার কিংবা নদী থেকে নানা কাজে ব্যবহার- নৌকাকে ঘিরেই চলে অনেক পরিবারের সংসার। সেই নৌকা ঢেউয়ের মুখে পড়ে ডুবে যেতে দেখে স্বজনদের মধ্যে শুরু হয় ছোটাছুটি।


বুধবার রাতে এমন পরিস্থিতিতে নৌকা রক্ষায় গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন একাধিক মাঝি ও তাদের স্বজনেরা। স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে বেশ কয়েকটি নৌকা ডুবে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অন্তত ৫ থেকে ৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের উদ্ধার করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।


হঠাৎ নদীর এমন আচরণে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা। বিশেষ করে যাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা নদীর কাছাকাছি, তাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। রাতের অন্ধকারে নদীর গর্জন আর তীরে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের শব্দে অনেকেই ঘর থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য হন।


নদীপাড়ের মানুষের ভয় শুধু নৌকা ডুবে যাওয়া কিংবা আহত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাদের বড় উদ্বেগ নদীভাঙন নিয়ে। পদ্মার পানি ও ঢেউয়ের চাপ বাড়লে তীরবর্তী বাঁধ ও বসতভিটা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়।


রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘হঠাৎ দমকা বাতাসে নদীর পানি ফুলে উঁচু ঢেউয়ের সৃষ্টি হতে পারে। এটি সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে এ ধরনের ঘটনাকে ‘ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট’ বলা হয়। এতে টি-বাঁধ ও টি-গ্রয়েনের কিছু ইটের ব্লক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে। পানি কমে গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।


গত ১০ দিনে রাজশাহীর পদ্মায় পানি বেড়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছালেও চলতি সপ্তাহে পানি প্রতিদিন কয়েক সেন্টিমিটার করে কমছে। এর মধ্যেই আকস্মিক ঢেউয়ে বাঁধ ও নৌকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নদীতীরের মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।


ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নদীর তীব্র ঘূর্ণিস্রোত, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া নৌকাডুবির অন্যতম প্রধান কারণ। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর অঞ্চলে পদ্মায় মোট ৪৫টি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ জন এবং নিখোঁজ বা যাদের মরদেহ পাওয়া যায়নি এমন মানুষের সংখ্যা আরও ২২ জন। মাঝপথে নৌকা এদিক-সেদিক হেলে পড়া বা অতিরিক্ত লোডিংয়ের কারণেও প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।


নাসার তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে পদ্মার আকার ও গতিপথ ধারাবাহিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায়ও উঠে এসেছে যে, ২০১৫ সাল থেকে পদ্মার উজানে ভাঙন প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পদ্মার তীরবর্তী জনপদগুলোতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।


নদী গবেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালে পদ্মা নদীর গতিপথ আরো বেশি পরিবর্তনশীল হয়ে উঠেছে। নদীটি এখন আগের তুলনায় বেশি আঁকাবাঁকা ও বহু শাখায় বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রভাবেও নদীর গতিপথ ও গঠন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর ফলে কোথাও তীব্র নদীভাঙন, আবার কোথাও দ্রুত পলি জমে নতুন চর সৃষ্টি হচ্ছে।


সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ থেকে ২০২৫—এ দুই দশকের মধ্যে পদ্মা নদীর ভাঙন সবচেয়ে তীব্র ছিল ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। পদ্মার ভাঙন ও চর জাগার প্রবণতা তুলনামূলক কম ছিল বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।


নদী গবেষক এআরএম খালেকুজ্জামান বলেন, পদ্মা ও আশপাশের নদীর ভাঙনটি আমরা সরজমিনে দেখেছি। নদীর স্রোতের একটি স্বাভাবিক প্রবাহ আছে। এ প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় চরের মাধ্যমে। চরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নদীর স্রোত চারপাশে ছড়িয়ে যায়। যে কারণে ভাঙন একদিকে না হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, পদ্মা নদীর বসতি এলাকার মাটির ৩০ থেকে ৩৫ ফুট গভীরে বালির স্তর রয়েছে। এভাবে স্রোত ছড়িয়ে পড়লে বালি স্রোতের সঙ্গে চলে যায় আর এলাকাটি ভেঙে যায়। যে লেভেলে গিয়ে বালি সরে যায়, ওই লেভেলে যদি জিও ব্যাগ বা আধুনিক কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে বালিটা আটকে রাখা যায়।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেবেকা সুলতানা বলেন, নদীর গভীরতা অসমান হওয়ায় এবং অতিরিক্ত পলি জমার কারণে পদ্মা বহু ধারায় ভাগ হয়ে গেছে। উজান থেকে নেমে আসা পানি পর্যাপ্ত গভীরতা না পেয়ে ডানে-বামে ছিটকে পড়ছে এবং চরাঞ্চল প্লাবিত করছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হয়ে বিক্ষিপ্ত ধারা তৈরি হওয়ায় বর্ষাকালে পানির বিশাল চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। 


তিনি আরও বলেন, রাজশাহী অংশে পদ্মার ২২৫ একর এলাকায় বৈধ ইজারা থাকলেও ঠিকাদাররা নিয়ম ভেঙে নির্দিষ্ট কিছু স্থান থেকে অতিরিক্ত বালু তুলছেন। এর ফলে নদীর তলদেশে তৈরি হচ্ছে বিপজ্জনক গভীর খাদ। একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের ফলে তৈরি হওয়া গভীর গর্তগুলোতে তীব্র ঘূর্ণাবর্ত বা ঘূর্ণিস্রোতের সৃষ্টি হয়। নদীতে পানি বেশি থাকলে নৌকাচালকরা এই গর্ত বা ঘূর্ণির অবস্থান বুঝতে পারেন না।