চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক, এক-তৃতীয়াংশ বাড়িতে এডিসের লার্ভা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ জন নতুন রোগী জেলা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ২৫ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনজনকে রেফার্ড করা হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী। এ পর্যন্ত চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন।
এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বসতবাড়িতে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি নিয়ে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালিত কীটতাত্ত্বিক জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। (আইইডিসিআর) ভাষ্য অনুযায়ী, এডিস মশার লার্ভার এমন ঘনত্ব ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার ১৫৪টি বসতবাড়িতে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে বিশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ চালানো হয়। জরিপের আওতায় নেওয়া বাড়িগুলোর মধ্যে ১৫০টি বাড়ির ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, এই হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি তিনটি বাড়ির একটিতে এডিস মশার প্রজননস্থল রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ. কে. এম. শাহাব উদ্দীন জানান, শহরের ১৫০টি বাড়িতে পরিচালিত জরিপে ৫৪টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাঁর হিসাবে লার্ভার ঘনত্ব ৩৬ ব্রুটো ইনডেক্স। স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এ মাত্রা উদ্বেগজনক ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ।
কোনো এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ২০ ব্রুটো ইনডেক্সের বেশি হলে ওই এলাকাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সেই হিসাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে পাওয়া ৩৬ ব্রুটো ইনডেক্সের মাত্রা পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরছে।
এদিকে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে জেলা হাসপাতালের ওপর। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ২৫ জন রোগী সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে আরও তিনজনকে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭৩ জন ডেঙ্গু রোগী। তাঁদের মধ্যে ৪৮ জন পুরুষ, ১৬ জন নারী এবং নয়জন শিশু।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আসমাউল ইসলাম সাগর গত সাত দিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন, দিন দিন হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বেড খালি না থাকায় কয়েকদিন ধরে তাঁকে হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান করতে হচ্ছে। মশার বংশবিস্তার বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
শহরের মসজিদপাড়া এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে তিনি ছাড়া বাকি তিনজনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের কারও তীব্র শরীরব্যথা হচ্ছে, আবার কারও শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ছোট শিশুর তীব্র জ্বর ও শরীরব্যথা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
শহিদুল ইসলাম অরও বলেন, একসঙ্গে পরিবারের একাধিক সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁরা চরম দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। শুধু তাঁদের বাড়িতেই নয়, আশপাশের অনেক বাড়িতেও ডেঙ্গু রোগী রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে এলাকাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি মশক নিধনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুব হাসান বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম হাসপাতালে রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বেড সংকট তৈরি হয়েছে। সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
চাঁপাইনবাবগন্জ পৌরসভার প্রশাসক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানাম ডেঙ্গু সংক্রমণ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ডেঙ্গু ও মশক নিধন বিষয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী। সেখানে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু নির্দিষ্ট সময়ে মশক নিধন অভিযান চালালেই হবে না। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়মিত ধ্বংস করতে হবে।
তিনি পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার ওপরও গুরুত্ব দেন। এ কাজে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় জানানো হয়, আইইডিসিআরের একটি প্রতিনিধি দল কয়েক দিন ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শনে শুধু বাড়ির বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার প্রজননস্থল থাকার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রজননস্থল ধ্বংসে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মো. মুশা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌর এলাকায় আটটি টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিম মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করবে এবং ডেঙ্গু সংক্রমণ বেশি এমন এলাকাগুলোতে কার্যক্রম জোরদার করার কথা রয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. এ. কে. এম. শাহাব উদ্দীন বলেন, ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়; গ্রামাঞ্চলেও রোগী পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এডিস মশা নির্মূল এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. আনিসুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন অর রশীদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, একদিকে হাসপাতালে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ ও বেড সংকট, অন্যদিকে আইইডিসিআরের জরিপে বসতবাড়িতে উচ্চমাত্রায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্ববহ করে তুলেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হলেও ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে নিয়মিতভাবে প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নাগরিকদের সম্পৃক্ততা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র প্রার্থী জাসদ নেতা মনিরুজ্জামান মনির অভিযোগ করে বলেন, কয়েক মাস আগে শহরে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা গেলেও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের এডিশ মশা নিধনে কোন কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে ডেঙ্গু ভয়াবহ অবস্থায়। তিনি পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কে মশা নিধনে ক্রাস প্রোগ্রাম চালনো উচিত বলে করেন।
উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ২১০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে বহির্বিভাগে নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৩৪ জনের এবং মোট শনাক্তের সংখ্যা ৯৪৩ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে অন্তত চাঁরজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত ২০/২৫ দিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রুগী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু বরন করে। পরে দুজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রুগী নিজ নিজ বাস ভবনে মারা যান। ্এছাড়া উন্নত চিকিৎসার জন্য মোট ৬৫ জন ডেঙ্গু রোগীকে রাজশাহী রেফার্ড করা হয়েছে।